সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচিত হয়েছে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে বিজয় লাভ করে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
এই ফলাফল কেবল একটি দলীয় জয় নয়, এটি দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন। দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিএনপিকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। বিজয়কে দেশবাসী উদযাপন করছে আনন্দের সঙ্গে, কিন্তু এটি দায়িত্বেরও বার্তা বহন করছে। জনগণ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা চায় গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন উন্নয়ন।
নতুন প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, নির্বাসন জীবন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যে দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন, তা তাকে সমসাময়িক রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। তার নেতৃত্বে জনগণ দেখতে পাচ্ছে একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক, যার লক্ষ্য হলো একটি আত্মমর্যাদাশীল, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। বিজয়ের মাধ্যমে জনগণ কেবল একটি দলের প্রতি আস্থা নয়, বরং নতুন বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছে।
জনগণের প্রত্যাশিত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে চ্যালেঞ্জ বড় হলেও অসম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত অবস্থান থেকে আজকের বাংলাদেশ প্রমাণ করে, সঠিক নেতৃত্ব থাকলে জাতির ভাগ্য বদলানো সম্ভব। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের পেছনে বিএনপির অবদান অস্বীকার করা যায় না। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন, কৃষি ও শিল্প খাতে সংস্কার এবং জাতীয়তাবাদী অর্থনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অবকাঠামো, শিক্ষা ও শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। এই ধারাবাহিকতার উত্তরাধিকার বহন করছেন তারেক রহমান, যার নেতৃত্বের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি।
বাংলাদেশে সমৃদ্ধির প্রধান স্তম্ভ হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এর মূল চালিকা শক্তি হলো দেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাত। বিশেষ করে রফতানিমুখী পোশাক শিল্প, যেখান থেকে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৩ শতাংশেরও বেশি আসে। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই খাতের অবদান অপরিসীম।
দেশে ফিরে তারেক রহমান বলেছিলেন, তার কাছে দেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং দেশের অর্থনীতি ও জনগণের কল্যাণে তার গভীর চিন্তাভাবনা এবং দায়িত্ববোধের প্রকাশ। বিশেষভাবে পোশাক শিল্পের উন্নয়নে তার বাস্তবভিত্তিক ও ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শিল্পের পথে বড় বাধা হলো জ্বালানি সংকট। দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ ঘাটতি এবং বারবার গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগ থেমে গেছে, অথচ মেনমেইড ফাইবারে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সমস্যার টেকসই সমাধানে প্রয়োজন শিল্পভিত্তিক গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার, নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা। পাশাপাশি, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জির দিকে অগ্রসর হওয়ার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন জরুরি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলেই বাংলাদেশ তার স্বপ্নবসতি সমৃদ্ধির পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হতে পারবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ১০০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে। অর্থাৎ রফতানির পরিমাণ বাড়লেও বন্দর সক্ষমতা তার সঙ্গে সঙ্গতি রাখছে না, যা শিল্পকে চাপের মুখে ফেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করান, বন্দরের চার্জ বৃদ্ধি নয়, বরং সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি। পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাস ও জাহাজীকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং যুগোপযোগী সংস্কার আনা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দরের পর্যাপ্ত নাব্যতার অভাব বড় সমস্যা। বড় আকারের মাদার ভেসেল বা বাণিজ্যিক জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভিড়তে পারে না। নিরাপদ নোঙর করার জন্য প্রায় ১৩ ফুট বা তার বেশি গভীরতা প্রয়োজন, যেখানে গড় গভীরতা মাত্র ৭ ফুটের মধ্যে। ফলে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে ছোট লাইটার জাহাজে আনা হয়, যা সময় বাড়ায় এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর বা টানেল নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত এ পথে অগ্রসর হতে হবে।
কাস্টমস বন্ড-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার কারণে পোশাক খাতে রফতানি প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হয়। প্রস্তুত পণ্য সময়মতো বিদেশী ক্রেতার কাছে না পৌঁছালে রফতানিকারকরা তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং ভবিষ্যৎ অর্ডারও হারাতে পারেন। কর, বন্দর ও শুল্ক-সংক্রান্ত জটিলতা উৎপাদন ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি করে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং দীর্ঘসূত্রতা কমানো অপরিহার্য।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও চ্যালেঞ্জ বড়। সহজ ঋণপ্রাপ্তি না থাকা, অনিশ্চিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কাস্টমস জটিলতা তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, সহজ ঋণ এবং সহায়ক নীতি প্রয়োজন। বৃহৎ শিল্পের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে। এলডিসি থেকে উত্তরণ যেমন গৌরবের, তেমনি নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ)’ সুবিধা হারানোর ফলে বড় বাজারে উচ্চ শুল্কের মুখে পড়তে হবে। এই প্রেক্ষাপটে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) ও অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) কৌশলগতভাবে এগোতে হবে, যাতে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।
সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংশোধনের কিছু বিধানও শিল্পমহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের বাস্তবতা ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয় এবং শিল্পে অস্থিরতা তৈরি না হয়। এই মুহূর্তে জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট: শিল্প ও বাণিজ্য খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। জাতীয় স্বার্থে অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পোশাক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে, যা ভবিষ্যতে রফতানি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তবে কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই যথেষ্ট নয়। দরকার ব্যবসাবান্ধব স্থিতিশীল নীতিসহায়তা। যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো প্রণয়ন জরুরি, যাতে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত দ্রুত ও টেকসইভাবে বিকশিত হতে পারে।
- আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ।

