সরকার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নিয়ে সজাগ অবস্থান নিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও আমদানি শুল্ক বিষয়ে কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হবে।
গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসব কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
মন্ত্রী বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও আমদানি শুল্ক বিষয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করা হবে না। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, তা সংবেদনশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বিকাশমান পরিস্থিতিতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। নতুন বৈশ্বিক শুল্ক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করার সময় নয়। পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার পরই পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।”
মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান শুল্ক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “সেখানে পরিস্থিতি এখনও পরিবর্তনশীল। সর্বোচ্চ আদালত আগের ধার্যকৃত শুল্ক মেইনটেইনেবল নয় বলে ঘোষণা করেছে। এরপর দেশটি সব দেশের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশ দিয়েছে। আমরা শুধু ঘোষণা শুনছি, সরকারি পর্যায়ে লিখিত কিছু এখনও পাইনি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ১২২ আইনি ব্যাখ্যা কংগ্রেস ১৫০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করবে।”
অতীতের বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চুক্তি এখনও বিশ্লেষণের পর্যায়ে আছে। পক্ষে-বিপক্ষে দুটি দিক থাকে, আমরা তা যাচাই করছি। এরপর করণীয় ঠিক করা হবে। সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। চুক্তির ধারা অনুযায়ী কিছু পক্ষে, কিছু বিপক্ষে হতে পারে। সবকিছু একতরফাভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক নয়। প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
মন্ত্রী আরও জানান, “কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা কার্যকর হওয়ার আগে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট আলোচনাকালীন সময়ের জন্য। তাই তখন তথ্য প্রকাশ সীমিত থাকে।” রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শের বিষয়ে তিনি বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বিএনপির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক পরামর্শ হয়নি।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের পরামর্শ:
বৈঠক সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বিষয়ে অন্য দেশগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তা নজর রেখে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক পরিস্থিতিতে সরকারকে সতর্কভাবে এগোতে হবে। ট্যারিফ হার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই ধীর ও বিবেচনাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাতিল করলেও মূল চুক্তি বহাল আছে, ফলে বিষয়টি জটিল। আইনি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। যে কোনো পর্যালোচনা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় করে করতে হবে।”
বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা উল্লেখ করেন, দ্রুত পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “মার্কিন চুক্তি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তাই এখনই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। শুল্কনীতির সিদ্ধান্ত ঘন ঘন পরিবর্তিত হচ্ছে। চূড়ান্ত অবস্থান না নেওয়া পর্যন্ত ধীর ও সতর্ক কৌশলই বুদ্ধিমানের কাজ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা চলছে।”

