গত বছর আলুর দামে ধস নামার পর অনেক কৃষক বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছিলেন। কেউ ঋণে জর্জরিত হয়েছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখে চাষের খরচ জোগাড় করেছেন। তখন আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল—পরের মৌসুমে হয়তো আলুর আবাদ কমে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে গত নভেম্বরে কৃষি মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা দেয়। চলতি অর্থবছরে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১১০ কোটি টাকা ভর্তুকির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। কৃষি উপদেষ্টা একাধিকবার গণমাধ্যমে এ ঘোষণা দেন।
কিন্তু এক মৌসুম শেষ হয়ে আরেক মৌসুম শুরু হলেও এখনো কৃষকের হাতে পৌঁছায়নি সেই প্রণোদনা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা তালিকা তৈরি করে পাঠালেও ভর্তুকির টাকা আটকে আছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম জানিয়েছেন, প্রস্তাবনা কৃষি মন্ত্রণালয় হয়ে এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
অর্থাৎ ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু মাঠে বাস্তবায়ন হয়নি।
গত বছরের আগস্টে সরকার ৫০ হাজার টন আলু সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার ঘোষণা দেয়। উদ্দেশ্য ছিল বাজার স্থিতিশীল রাখা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। পরে সরকার আলু কেনা থেকে সরে দাঁড়ায়।
একই সময়ে ঘোষণা দেওয়া হয়—হিমাগারের ফটকে আলুর সর্বনিম্ন দর হবে কেজিপ্রতি ২২ টাকা। কিন্তু বাজারদর সে ঘোষণার তোয়াক্কা করেনি। বরং দাম আরও নেমে যায়। ফলাফল—হাজার হাজার টন আলু হিমাগারে পড়ে থেকে পচে যায়।
সংরক্ষণ খরচ, সুদ ও পরিবহন ব্যয় মেটাতে না পেরে অনেক কৃষক আলু তুলতেই পারেননি। কেউ কেউ লোকসান গুনে আলু ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
লোকসানের ক্ষত শুকানোর আগেই কৃষক আবার নতুন মৌসুমে আলু চাষ করেছেন। চড়া দামে সার ও কীটনাশক কিনেছেন। আশায় ছিলেন—এবার হয়তো ঘুরে দাঁড়ানো যাবে।
কিন্তু এবারও বাজারে একই চিত্র। নতুন আলু এলেও হিমাগারে পুরোনো আলুর উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম অস্বাভাবিকভাবে কমেছে।
কৃষকদের অভিযোগ—উৎপাদন খরচই উঠছে না। অনেক এলাকায় কেজিপ্রতি আলুর দাম নেমে এসেছে উৎপাদন ব্যয়ের নিচে।
ঠাকুরগাঁও ও রংপুর অঞ্চলে নতুন আলুর দাম নেমে এসেছে কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৬ টাকায়। অথচ কৃষকের হিসাবে, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা। অর্থাৎ কেজিপ্রতি ৯ থেকে ১১ টাকা পর্যন্ত লোকসান।
রংপুর অঞ্চলে ক্ষেতে আলু বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা মণ দরে, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম।
জয়পুরহাট, নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জে পাইকারি বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১২ থেকে ১৫ টাকায়। ফলে অনেক কৃষক নতুন করে ঋণের চাপে পড়ছেন।
এক বিঘা জমিতে আলু চাষে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। শুধু বীজেই লাগে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সার, কীটনাশক, শ্রম, সেচ ও পরিবহন মিলিয়ে বাকি খরচ।
ভালো ফলন হলে ৭৫ থেকে ৮৫ মণ আলু পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে আয় হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা ঘাটতি।
বগুড়া, জয়পুরহাট ও রংপুরে গত দুই মৌসুমে মোট ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ১,২০০ থেকে ১,৫০০ কোটি টাকা।
বগুড়ার মহাস্থানহাটে সারি সারি আলুর স্তূপ। কৃষক বসে আছেন, কিন্তু নেই ক্রেতা। কেউ ২৩ মণ আলু নিয়ে এসে মাত্র ছয় মণ বিক্রি করতে পেরেছেন ৩০০ টাকা দরে। কেউ ২২ মণ আলু নিয়ে বসে থেকেও বিক্রি করতে পারেননি।
অনেক কৃষক বলছেন—মণপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা না পেলে খরচই উঠবে না।
উত্তরাঞ্চলে ১০৬টি হিমাগার রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন। কিন্তু সংরক্ষণ ভাড়া মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। পরিবহনসহ অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়।
গত বছরের লোকসানের অভিজ্ঞতায় অনেক কৃষক এবার হিমাগারে আলু রাখতে চাইছেন না। হিমাগার মালিকরাও সতর্ক। কেউ কেউ সংরক্ষণ ভাড়ার অর্ধেক অগ্রিম নিচ্ছেন।
বগুড়ায় ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ টন উৎপাদন হলেও ২০২৪-২৫ মৌসুমে তা ১০ লাখ টন ছাড়িয়েছে। জয়পুরহাটে উৎপাদন পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন থেকে বেড়ে প্রায় ছয় লাখ ৩০ হাজার টনে। রংপুরে উৎপাদন প্রায় ৯ লাখ টনের কাছাকাছি।
কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে এসেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, শুধু ঘোষণা নয়—সময়মতো বাস্তব পদক্ষেপ জরুরি। পরিকল্পিত উৎপাদন, কার্যকর সরকারি ক্রয়, উন্নত সংরক্ষণ ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদনের প্রাচুর্য যেন কৃষকের জন্য অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়—তার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
আলু দেশের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য। কিন্তু দাম ধস, বাস্তবায়নহীন সরকারি ঘোষণা ও সংরক্ষণ সংকট মিলিয়ে কৃষক আজ অনিশ্চয়তার মুখে।
প্রণোদনা যদি কাগজেই আটকে থাকে, আর সরকারি ক্রয় যদি বাস্তবায়ন না হয়—তবে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের ভাগ্যে সচ্ছলতা আসবে না।
প্রশ্ন এখন একটাই—ঘোষণা নয়, কবে মিলবে বাস্তব সহায়তা?

