ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে আবারও ডলারের দিকে ঝুঁকছেন। বিশ্লেষকদের ভাষায়, ডলার তার ঐতিহ্যগত ‘ক্রাইসিস কারেন্সি’ বা সংকটকালীন নিরাপদ মুদ্রার পরিচয় পুনরুদ্ধার করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার বিশ্বের প্রধান প্রায় সব মুদ্রার বিপরীতে ডলার শক্তিশালী হয়েছে। ডলার সূচক—যা ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের অবস্থান নির্দেশ করে—প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। সাত মাসের মধ্যে এটি সূচকের সর্বোচ্চ একদিনের উত্থান।
গত কয়েক মাস ধরেই ডলারের অবস্থান নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেন এবং দিনটিকে ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণা করেন, তখন প্রত্যাশিতভাবে ডলার শক্তিশালী হয়নি। বরং ডলার ও বৈশ্বিক শেয়ারবাজার একসঙ্গে বড় পতনের মুখে পড়ে। এতে প্রশ্ন ওঠে—চাপের সময় ডলারের আকর্ষণ কি কমে যাচ্ছে?
কানাডার স্কশিয়াব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ এরিক থিওরেট বলেন, এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ধ্রুপদি। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলার বেছে নিয়েছেন। তাঁর মতে, আগের অস্থিরতায় ঝুঁকির উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। তাই তখন ডলার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় ছিল না।
সাধারণত সোনার দাম বাড়লে ডলারের দাম কমে। কিন্তু এবার দুটিই একসঙ্গে বাড়ছে। গোল্ড প্রাইস ডট অর্গের তথ্যানুসারে, সোমবার সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৮৮ ডলারের বেশি বেড়ে ৫ হাজার ৩৬৬ ডলার ছাড়িয়েছে। জানুয়ারিতে সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৮৯ ডলারে উঠেছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই রেকর্ড আবারও ভাঙতে পারে।
এমন সমান্তরাল উত্থান বাজারে অস্বাভাবিক হলেও এর পেছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি বাজারের চাপ।
মার্কিন আর্থিক বাজারের গভীরতা ও ট্রেজারি বাজারের শক্ত ভিত ডলারের বড় সুবিধা। এরিক থিওরেটের ভাষায়, বড় পরিসরে ঝুঁকি কমাতে চাইলে মার্কিন ট্রেজারি বাজারই একমাত্র জায়গা, যা সেই সক্ষমতা রাখে। সংকটের সময় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করলে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের চাহিদা বাড়ে।
মার্সার অ্যাডভাইজার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডন ক্যালকাগনি বলেন, ডলারের কার্যকর বিকল্প নেই। অস্থিরতার সময়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলার এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
বিশ্লেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গত বছর ডলার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করতে পারেনি কারণ ঝুঁকির উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের শুল্ক-ঝড় বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। যে দেশ নিজেই সংকটের কেন্দ্র, তার মুদ্রায় আশ্রয় নিতে বিনিয়োগকারীরা অনীহা দেখান—এটাই স্বাভাবিক।
ম্যাক্রো হাইভের গবেষক বেঞ্জামিন ফোর্ড বলেন, এখন তেলের দাম বাড়ছে এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক পরিসরে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আবার ডলারের দিকে ঝুঁকছেন।
বিএনওয়াইয়ের কৌশলবিদ জন ভেলিসের মতে, যখন সংকট আন্তর্জাতিক, তখন ডলারের আবেদন অটুট থাকে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক। ফলে তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে। এ কারণেও ডলার শক্তি পাচ্ছে।
তবে রাবোব্যাংকের জেন ফোলি সতর্ক করে বলেছেন, বিতর্ক শেষ হয়নি। স্টেট স্ট্রিটের অ্যারন হার্ড মনে করেন, জ্বালানি বা তারল্য সংকটের বাইরে অন্য ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কায় ডলার একইভাবে শক্তিশালী নাও থাকতে পারে।
ফোর্ডের মতে, স্বল্পমেয়াদে ডলারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে তেলের দামের ওপর। তেলের দাম বাড়তে থাকলে ও বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কম থাকলে ডলারের চাহিদা বাড়বে। তবে তেলের দাম কমলে সুইস ফ্রাঁ ও জাপানি ইয়েনের মতো প্রচলিত নিরাপদ মুদ্রা আবার শক্তিশালী হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার তার পুরোনো ‘নিরাপদ আশ্রয়’ পরিচয় পুনরুদ্ধার করেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এটি কি স্থায়ী প্রত্যাবর্তন, নাকি কেবল ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সাময়িক প্রতিক্রিয়া?
বাজার বলছে, আপাতত ডলারই ভরসা। তবে দীর্ঘমেয়াদে ডলারের অবস্থান নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি, বৈশ্বিক আস্থা এবং জ্বালানি বাজারের গতিপথের ওপর।

