ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে জ্বালানি পণ্যের আমদানি মূল্য দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী চলতি মার্চ মাসে স্পট মার্কেট থেকে অন্তত চার কার্গো এলএনজি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ এ মাসে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা সরকারের ছিল না।
সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিস্তৃত হওয়ায় ৩ মার্চ মঙ্গলবার জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করা হয়। তাকে জানানো হয়, হুরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকা এবং কাতার এনার্জি উৎপাদন স্থগিত রাখায় কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ সময় আরও জানানো হয়, ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় চলতি মাসে দুই কার্গো এলএনজি সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত আরও দুই কার্গো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে পুরো মাসের চাহিদা পূরণে কমপক্ষে আট কার্গো এলএনজি প্রয়োজন।
জ্বালানি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্পট মার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির মূল্য তাৎক্ষণিক পরিশোধের সুবিধার্থে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। বেসরকারি খাতের এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর পেট্রোবাংলা দ্রুত দুই কার্গো এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে আমদানির জন্য টেন্ডার আহ্বান করবে। বাকি দুই কার্গোর টেন্ডার কিছুদিন পর আহ্বান করা হবে।
গ্যাস সরবরাহের চিত্র:
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ২,৬০০ থেকে ২,৯০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ৯০০ থেকে ৯৮০ এমএমসিএফডি আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। বছরে মোট ১১০ থেকে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ কার্গো আসে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, আর বাকি অংশ স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করা হয়।
সর্বশেষ ৩ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২,৬৬২ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫২ এমএমসিএফডি এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
জ্বালানি তেলের মজুত ও বিকল্প উৎস:
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কাছে দুই লাখ টনের বেশি ডিজেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে ১৪ দিন পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য বিকল্প উৎস হিসেবে মালয়েশিয়া, চীন ও সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ভারত থেকে আসা পরিশোধিত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরামকো জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের বাইরের উৎস থেকেও বাংলাদেশকে তেল সরবরাহ করবে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ৩ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ১৬ হাজার ১০ টন ডিজেল, ২১ হাজার ৭০৫ টন পেট্রোল এবং ৩৪ হাজার ১৩৩ টন অকটেন মজুত রয়েছে। পদ্মা অয়েলের কাছে ২০ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ জেট ফুয়েল মজুত আছে। বর্তমানে উড়োজাহাজ চলাচল কম থাকায় জেট ফুয়েলের চাহিদাও কিছুটা কম।
বেসরকারি খাতের এলপিজি পরিস্থিতি:
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বেসরকারি আমদানিকারকদের ফেব্রুয়ারি মাসে খোলা এলসির বিপরীতে মার্চে ১ লাখ ৯৪ হাজার টন এলপিজি দেশে আসার কথা রয়েছে। তবে হুরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় কিছু এলপিজি সময়মতো পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতকে বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

