বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের অর্ধেকের বেশি সরবরাহ করছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। এছাড়া দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি স্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি, যা দেশে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে আগামীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি করবে বাংলাদেশ। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো দেশের বড় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বন্ধ হওয়ার কারণে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানা গেছে।
স্থানীয় উৎপাদন থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে মোট ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে শেভরন পরিচালিত ক্ষেত্র থেকে আসে ৯৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা স্থানীয় উৎপাদনের ৫৬ শতাংশ। দেশে মোট দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি, যেখানে শেভরনের অংশ ৩৬ শতাংশ।
দেশের ২০টি গ্যাস ফিল্ডের মধ্যে মোট উৎপাদনের ৪৮ শতাংশ আসে বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেভরনের এই ফিল্ড একাই দেশের গ্যাস সরবরাহকে স্থিতিশীল রেখেছে। তবে ফিল্ডটির মজুদ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং উৎপাদন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। যদি বড় পরিমাণে বিবিয়ানার গ্যাস সরবরাহ কমে যায়, তাহলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত তীব্র ঝুঁকিতে পড়বে।
শেভরনের বাংলাদেশের ইতিহাস: ১৯৯৫ সালে পিএসসি চুক্তির আওতায় অনশোর ব্লক ১২-তে কাজ শুরু করে শেভরন। ১৯৯৮ সালে আবিষ্কৃত বিবিয়ানা ফিল্ড থেকে ২০০৭ সালে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। ১৮ বছরের বেশি সময় ধরে ফিল্ডটি সক্রিয়। এছাড়া শেভরন জালালাবাদ এবং মৌলভীবাজার ফিল্ড থেকেও গ্যাস সরবরাহ করছে।
দেশের গ্যাস আমদানিতেও যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি কার্যক্রম চালাচ্ছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করছে তারা। ২০১৬ সালে পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি সই হওয়ার পর ২০১৮ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার মধ্যে এক্সিলারেটের অংশ ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দীর্ঘ সাত বছর ধরে কোম্পানি দেশে এলএনজি সরবরাহের দায়িত্ব পালন করছে। তাদের সঙ্গে পেট্রোবাংলার ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি আছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়টি ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশ আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করবে। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি ‘অফট্র্যাক এগ্রিমেন্ট’ও অন্তর্ভুক্ত।
গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। ঢাকায় দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
মন্ত্রী বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের কমিটমেন্ট অনুযায়ী সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছি, সংকট মুহূর্তে তারা কীভাবে সহায়তা করতে পারে। আমরা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেও আগ্রহী।”
বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থায় জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ ছাড়া বিকল্প নেই। ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “যেকোনো উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সব ধরনের সরবরাহ অচল, তাই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, “আপৎকালীন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ চলতে থাকায় এখন যে কোনো উৎস থেকে গ্যাস নেওয়া জরুরি। দামের বিষয়ে এখন বিবেচনার সুযোগ কম, মূল বিষয় হলো গ্যারান্টিড সাপ্লাই।” তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা দেশের সবখাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং বিদেশি অংশীদারের সঙ্গে এই অংশীদারিত্ব কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে।

