মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত এখন সরাসরি এসে ঠেকেছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। সংঘাতের জেরে কাতারের বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফান শিল্প এলাকা-তে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালী। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এলএনজির দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। কারণ কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী দেশ। চলতি মাসে কাতার থেকে নির্ধারিত দুটি এলএনজি কার্গো আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার স্পট মার্কেট থেকে আরও দুটি এলএনজি কার্গো আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এখনো সরবরাহকারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস রেশনিং শুরু হয়েছে।
সংকট শুধু গ্যাসে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের প্রভাবে কাঁচা তেলের দামও দ্রুত বেড়ে গেছে। গত মাসের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি দাম এখন ৮৪ ডলারের কাছাকাছি। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সংঘাত দ্রুত না থামলে এই দাম শতক অতিক্রম করতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেল প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ রেকর্ড ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তুরস্কভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল ৮৬ শতাংশ কমেছে। প্রণালির দুই প্রান্তে প্রায় ৭০০টি জাহাজ আটকে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি কেন্দ্র-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক রাচেল জিয়েম্বা বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ায় যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তা স্পষ্ট। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে এশিয়ার বাজারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের তেলবাহী দুটি জাহাজ সৌদি আরবের বন্দরে আটকে আছে। ফলে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও সার সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা কতদিন স্থায়ী হবে, এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এলএনজি নিয়ে শঙ্কা
দেশে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় সরবরাহ ছিল মাত্র ২৫২ কোটি ঘনফুট, যা আগের বছরের তুলনায় কম। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ২০১৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে ঘাটতি পূরণে বাড়ছে আমদানির ওপর নির্ভরতা। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এলএনজি থেকে আসে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টন কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আসে। ২০২৫ সালে কাতার এনার্জি ৪০টি কার্গো সরবরাহ করেছে। এছাড়া ওমান থেকেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আসে।
সরকার স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি সংগ্রহ করছে। সরবরাহকারী হিসেবে রয়েছেন ভিটল, পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল, টোটাল এনার্জিস, পস্কো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কাতারের এলএনজি সরবরাহ দীর্ঘস্থায়ীভাবে বন্ধ হলে বাংলাদেশ বড় সমস্যায় পড়বে। ইতোমধ্যে সরকার কাতারকে চিঠি পাঠিয়েছে। কাতার সরাসরি বাতিল না করলেও সরবরাহ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসে আসার কথা থাকা ৯টি কার্গোর মধ্যে ছয়টির উৎস কাতার। এর মধ্যে চারটি কার্গো হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে নিরাপদে এসেছে। তবে ১৫ ও ১৮ মার্চ কাতার থেকে আসার কথা থাকা দুটি কার্গো এখনও আটকে আছে। এই কারণে সরকার স্পট মার্কেট থেকে দুটি কার্গো আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে গত মঙ্গলবার দরপত্র ডাকা হলেও চুক্তিবদ্ধ ২৪টি কোম্পানি কোনো সাড়া দেয়নি। বুধবার পুনরায় দরপত্র ডাকা হয়েছে, যা আজ বৃহস্পতিবার খোলা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার এক পরিচালক বলেন, “হয় কোম্পানিগুলোর কাছে এলএনজি নেই, নয়তো তারা তা ধরে রেখেছে, যাতে দাম আরও বাড়ে।” স্পট মার্কেটে এলএনজির ইউনিটপ্রতি দাম গতকাল ২৫ ডলার উঠেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১২–১৩ ডলার।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, এই মাসে ৯টি কার্গো আসার কথা থাকলেও দু-একটির বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সরকার বিকল্প উৎস খুঁজছে। পরবর্তী কার্গোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে দুটি, আফ্রিকা থেকে একটি আসবে। এদের সূচি এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। আগামী মাসে আবার কাতার থেকে কার্গো আসার কথা রয়েছে।
তিনি বলেন, স্পট মার্কেটে এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। এর দুটি কারণ হতে পারে। প্রথমত, আমাদের এফএসআরইউ যেহেতু নির্দিষ্ট ফিক্সড, তাই কোন জাহাজ কখন আসবে তা সূচি অনুযায়ী হতে হয়। একটি জাহাজ আটকে রাখলে প্রতিদিন ৭৮ হাজার ডলার জরিমানা দিতে হয়। তাই সূচিতে ব্যাঘাত ঘটলে সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা কার্গোগুলো ১৫ মার্চের মধ্যে পৌঁছানো নাও হতে পারে। এছাড়া সরবরাহকারীদের কাছে বিকল্প উৎসও নাও থাকতে পারে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের বছর ৮৬টি কার্গোর জন্য খরচ ছিল ৩ হাজার ২২ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮৫৫ মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। চলতি বছর সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ১১৫টি কার্গো আমদানি হবে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি, ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা। আমদানি বৃদ্ধির কারণে খরচ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গড় এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১৮ দশমিক ৪৩ ডলারে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ১২ দশমিক ৮৪ ডলারে। ২০২৫ সালের জুনে ছিল ১৩ দশমিক ৫২ ডলার এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ০২ ডলারে। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ১২ ডলারে এলএনজি কিনেছিল। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজির দাম পড়ছে ৯–১০ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে এলএনজির দাম ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। যুদ্ধ বন্ধ না হলে স্পট মার্কেট থেকে বাংলাদেশকে আরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, সংঘাত দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে বাংলাদেশকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হবে। এতে আমদানি খরচ বেড়ে যাবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে এবং ভর্তুকির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
এলএনজি আমদানিতে ব্যাঘাত দেখা দেওয়ায় সরকার বিকল্প হিসেবে গ্যাস রেশনিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রেশনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন ১৮–২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ করা হবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎখাতে পাঁচ কোটি ঘনফুট এবং বাকিটা সার কারখানায় ব্যবহৃত হবে। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুতে সরবরাহ হচ্ছে ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। বেশি গরম না থাকায় বর্তমানে লোডশেডিং নেই। তবে পাঁচ কোটি ঘনফুট কম সরবরাহ হলে ৫০০–১০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কম হতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভাগকে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
বোরো মৌসুমের কারণে সারের চাহিদা থাকায় তিনটি কারখানা চালু রাখা হয়েছে। এসব কারখানায় গতকাল ১৭ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়েছে। রেশনিংয়ের কারণে সব কারখানা বন্ধ রেখে শুধুমাত্র শাহজালাল সার কারখানা চালু রাখা হবে।
জ্বালানি তেলের সমস্যা
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো থেকে ১ লাখ টন করে মোট ২ লাখ টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ ২ মার্চ বন্দর ছাড়ার কথা ছিল। তবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জাহাজ দুটি সৌদিতে আটকে আছে। এগুলো ১৩ মার্চ নাগাদ চট্টগ্রামে পৌঁছার কথা ছিল। এর ফলে চালান অনিশ্চিত হয়ে গেছে। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা জাহাজগুলোর রুটে কোনো সমস্যা নেই। বর্তমানে ডিজেলের মজুদ ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস তেল ৯৩ দিন এবং জেড ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুদ আছে।
বাংলাদেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৫ লাখ টন। এর প্রায় সবই আমদানিকৃত। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক হাজার কোটি টাকা করে মুনাফা করেছে। সংস্থাটির মতে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৭২ ডলার অতিক্রম করলে লোকসান শুরু হয়। চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৭ ডলার থেকে ৮৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি।
ভর্তুকির চাপ
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ ভর্তুকি বরাদ্দ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল, এই ভর্তুকি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে তা আরও বাড়তে পারে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৫ বছরে বিদ্যুতের দাম ১৪ বার বাড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছর দাম বাড়ায়নি। নতুন সরকার জানিয়েছে, আগামী দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না, সিস্টেমলস কমিয়ে খরচ সমন্বয় করা হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সিস্টেমলস কমিয়ে লোকসান সামলানো সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সামলাতে ভর্তুকি বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

