মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। শিপিং লাইনগুলোর বুকিং স্থগিত হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে সাপ্তাহিক এক হাজারের বেশি টিইইউ (বিশ ফুট সমতুল্য ইউনিট) রপ্তানি পণ্য আটকে গেছে। ফলে রপ্তানিকারকেরা বাড়তি সংরক্ষণ ব্যয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
বর্তমানে আলু, বিভিন্ন কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং তৈরি পোশাক বোঝাই অসংখ্য কনটেইনার বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোতে (আইসিডি) পড়ে আছে। শিপিং রুট পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত এসব পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে রপ্তানিকারকদের প্রতিদিনই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ডিপো ভাড়া ও প্লাগিং চার্জ। এই অচলাবস্থার প্রথম ধাক্কা লাগে দুবাইগামী একটি মৌসুমি আলুর চালানে।
এসআর ইমপেক্স লিমিটেডের ২৮ টন আলু প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিং শেষে ১ মার্চ বগুড়া থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছায়। পরদিন চালানটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরের উদ্দেশে জাহাজে তোলার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বুকিং বাতিল হওয়ায় কনটেইনারটি ডিপো থেকেই আর বের হতে পারেনি। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে শিপিং লাইনগুলো হঠাৎ করেই মধ্যপ্রাচ্যের গন্তব্যে নতুন বুকিং নেওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে কনটেইনারটি এখন একটি বেসরকারি আইসিডিতে আটকে আছে।
এসআর ইমপেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ফ্রেশ ফুড অ্যান্ড ফ্রুটস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, পণ্য জাহাজে তোলার প্রস্তুতির সময় হঠাৎ শিপিং লাইন থেকে জানানো হয় তারা আর বুকিং নেবে না। এতে তাদের নির্ধারিত স্লটও বাতিল হয়ে যায়।
তিনি জানান, আলু যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য অন্য একটি ডিপো থেকে কোনোভাবে কনটেইনার সংগ্রহ করে সেটিতে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন কেবল পণ্য সংরক্ষণের জন্যই প্লাগিং ও ডিপো চার্জ গুনতে হচ্ছে। সামনে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, সাধারণত প্রতি সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রায় ৪৫০ টন আলু রপ্তানি হয়। পাশাপাশি আরও প্রায় ৪৫০ টন কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্য এবং প্রায় ৩০০ টন হিমায়িত খাদ্য পাঠানো হয়। তৈরি পোশাকসহ এসব রপ্তানির মোট মূল্য প্রায় ১৭ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে এসব চালানের বড় অংশই ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সংকট আরও বাড়তে পারে। এতে দেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।
ঈদের বাজার ঘিরে উদ্বেগ পোশাক খাতে
এই পরিস্থিতি দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পকেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অংশ মাত্র দুই শতাংশের কিছু বেশি, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার। তবে ঈদের মৌসুমে এই বাজারের গুরুত্ব অনেক বেশি। রপ্তানিকারকেরা বলছেন, সাধারণত রমজানের শুরুতেই ঈদের বাজারের জন্য পণ্য পাঠানো হয়। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় শিপমেন্ট বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
পোশাক রপ্তানিকারক আবদুস সালাম জানান, কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন ও অর্ডার—সব প্রস্তুতি শেষ। এখন ক্রেতাদের শোরুমে ঈদের স্টক পৌঁছানোর কথা। কিন্তু যুদ্ধের কারণে পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, একদিকে ক্রেতাদের শোরুমে পণ্যের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দেশে কর্মীদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধের চাপ রয়েছে। ফলে রপ্তানিকারকেরা কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।
শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি গন্তব্যে কনটেইনার বুকিং সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশনস আজমির হোসেন চৌধুরী বলেন, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জন্য নতুন বুকিং না নেওয়ার নির্দেশনা পাওয়া গেছে। সেই অনুযায়ী তারা ২ মার্চ থেকে বুকিং গ্রহণ বন্ধ রেখেছেন। তার ভাষ্য, অন্য শিপিং লাইনগুলিও একই পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০০ থেকে ১,২০০ টিইইউ রপ্তানি পণ্য পাঠানো ব্যাহত হচ্ছে।
আমদানিতেও চাপ বাড়ছে
এই সংকট কেবল রপ্তানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রপথে বিঘ্নের কারণে শিল্পের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ চীন থেকে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়তে শুরু করেছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে চীনের বন্দরগুলো থেকে কনটেইনারপ্রতি জাহাজ ভাড়া প্রায় ৩০০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম বলেন, ভাড়া বৃদ্ধি আমদানিকারকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে চীন থেকে হাই-কিউব কনটেইনারে পণ্য আমদানির ভাড়া প্রায় ৫০০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। চীনের বন্দরগুলোতে রপ্তানি কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও এই উচ্চ জাহাজ ভাড়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বড় শিপিং কোম্পানির সেবা সীমিত
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের বড় শিপিং কোম্পানিগুলোও ওই অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম সীমিত করছে। শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক ১ মার্চ থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও ওমানসহ কয়েকটি গন্তব্যে নতুন বুকিং নেওয়া বন্ধ করেছে।
অন্যদিকে কসকো শিপিং লাইনস নিরাপত্তা ঝুঁকি ও চলাচল সীমাবদ্ধতার কারণে কাতার, বাহরাইন, ইরাক ও কুয়েতের কিছু বন্দরে সাময়িকভাবে কার্গো সেবা বন্ধ রেখেছে। তবে যেসব বন্দরে পৌঁছাতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না—যেমন সৌদি আরবের জেদ্দা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান ও ফুজাইরাহ—সেসব গন্তব্যে তাদের সেবা চালু থাকবে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

