মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি–এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট–গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির মুখে। নিরাপত্তাজনিত কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো এখন এই রুটগুলো এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে অনেককে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা যাত্রার সময় বাড়াচ্ছে এবং জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি আমদানি-রপ্তানিতে নির্ভরশীল দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে পড়তে পারে।
অস্থিতিশীলতা শুধু নৌপথে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারেও এখন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধ আর কেবল সীমান্ত বা অস্ত্রের সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন প্রতিটি সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
কিউসি শিপিং লিমিটেডের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার স্বপন ঘোষ বলেন, “বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এবং কনটেইনার পরিবহনের ৩০ শতাংশ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল দিয়ে সম্পন্ন হয়। এছাড়া, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই রুটগুলো অনিরাপদ হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের হৃৎস্পন্দন থেমে যেতে পারে। বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো সুয়েজ খালের পরিবর্তে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে যাত্রা করছে। এতে জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত ৩,৫০০ থেকে ৬,০০০ মাইল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, যা ১০ থেকে ১৫ দিন বেশি সময় নিচ্ছে।” এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতার নতুন অধ্যায় শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক গ্লোবাল শিপিং লাইনের অপারেশনাল ডিরেক্টর জানালেন, “আমরা এই পরিস্থিতিকে লজিস্টিক বিপর্যয় হিসেবে দেখছি। আমাদের অপারেশনাল শিডিউল পুরোপুরি ভেঙে গেছে। সিঙ্গাপুর পোর্ট এখন জাহাজজটের মুখে পড়েছে, কারণ ইউরোপগামী জাহাজগুলো নির্ধারিত সময়ে ফিরে আসতে পারছে না। এর ফলে খালি কনটেইনারের তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি এশিয়া অঞ্চলের রপ্তানিকে আঘাত করছে।”
মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাং ভিত্তিক এক শিপিং লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ বলেন, “লোহিত সাগরের অস্থিরতা মানেই জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি। আমরা বাধ্য হয়ে ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করতে হচ্ছে। পোর্ট ক্লাং থেকে উত্তর ইউরোপগামী ফ্রেইট রেট ইতিমধ্যে ২০০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, অনেক ছোট শিপিং লাইন টিকে থাকতে পারবে না।” এই তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের বর্তমান চ্যালেঞ্জকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, যেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি, খালি কনটেইনার সংকট এবং বেড়ে চলা ফ্রেইট খরচ একসঙ্গে বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে বিশ্বখ্যাত শিপিং জায়ান্ট মায়েরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, ইরাক, কুয়েত এবং সৌদি আরবের দাম্মাম ও জুবাইল বন্দরে সব নতুন বুকিং তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, পূর্ববর্তী কনফার্ম বুকিংগুলো পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে পর্যালোচনা করা হবে এবং ট্রানজিটে থাকা কার্গোগুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে প্রভাব
সুয়েজ খালের ট্রানজিট ফি মিশরের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় দেশটি বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি এশীয় পণ্য ও জ্বালানির জন্য এই রুটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরবরাহে বিলম্বের কারণে উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ ভারত ও চীনের শিপিং ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমমুখী রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের অস্থিরতা আরও বাড়াচ্ছে।
লোহিত সাগর ও চট্টগ্রাম বন্দর
প্রতিবছর অন্তত ১৭ হাজার জাহাজ লোহিত সাগর দিয়ে চলাচল করে। লোহিত সাগর এবং চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে প্রধান সংযোগটি সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়, যা লোহিত সাগর হয়ে মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনে গন্তব্যে পৌঁছে। বিকল্প রুটে পণ্য আনা-নেওয়া করতে গেলে সময় দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ পণ্য নিয়ে এসেছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, বর্তমানে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, “আমদানি-রপ্তানিতে এখনও কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পড়েনি।”
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ভোগ্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, “জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিক রুট বন্ধ হলে বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হয়। এতে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যায়। আমাদের একটি জাহাজ ইতোমধ্যে আরব আমিরাতে আটকা পড়েছে। নাবিকরা সুস্থ আছেন। তবে আমরা আশা করি, বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হবে।”
পোশাক খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে দ্রুততম নৌপথ হিসেবে সুয়েজ খাল লোহিত সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ দেশে পৌঁছাতে মূল রুট হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহার করা হয়। এটি পরিবহন ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। কিন্তু চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই রুটটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বিকল্পভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছাতে হচ্ছে, যা পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সাধারণত কম মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে। শিপিং খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাবে, লিড টাইম দীর্ঘ হবে, অর্ডার বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে এবং কাঁচামাল ও রিজার্ভ সংকট দেখা দিতে পারে।
একাধিক পোশাক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, বায়াররা ইতোমধ্যে পণ্যের সময়মতো জাহাজে ওঠা নিশ্চিত করতে খোঁজ নিচ্ছে। এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই খাত চেইনের মতো কাজ করে। যদি এক সপ্তাহ পর জাহাজ জট বা কনটেইনার সংকট হয়, তবে ফ্যাক্টরিতে লে-অফ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে কারখানায় কাজ করে, তাদের বেতন নির্ভর করে পণ্য সময়মতো পৌঁছানোর ওপর। যুদ্ধ ওখানে হচ্ছে, কিন্তু আমাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে এখানে।”
চট্টগ্রামের মদিনা গার্মেন্টেসের মালিক মোহাম্মদ মুসা জানান, “এমনিতেই পোশাক খাতের অবস্থা নাজুক। এই যুদ্ধের কারণে খাতে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় বয়ে আসবে। বিদেশি ক্রেতারা অতিরিক্ত খরচ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেন, যা সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের চাল, ডাল, তেল এবং গমের সিংহভাগ আসে। যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া বা ‘ফ্রেইট চার্জ’ বেড়ে গেলে আমদানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়। তবে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন বলেন, “অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যের দাম এখনও স্বাভাবিক। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ঈদের পর বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রণালির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পরিবহন করা হয়। হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ করেছে। ইতোমধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে জানিয়েছেন বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশে ১৪ দিনের ডিজেল, ২৮ দিনের অকটেন, ১৫ দিনের পেট্রল, ৯৩ দিনের ফার্নেস ফুয়েল এবং ৫৫ দিনের জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে। এই মজুত থাকা অবস্থায় দেশে দাম বাড়ার শঙ্কা নেই।”

