মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশি পোশাক খাতে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আকাশপথে চলাচল ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় জরুরি চালান বিমানবন্দরে আটকে পড়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালসহ উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোও কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রপথে রফতানিতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দেশের রফতানি আয়ের অন্যতম উৎস তৈরি পোশাক শিল্পকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে আট মাস ধরে রফতানি খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে, নতুন পরিস্থিতি আরও চাপ বাড়াবে,” জানান খাতের একটি সূত্র।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ব পোশাক উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কারখানাগুলো থেকে ইউরোপের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নিয়মিত পোশাক সরবরাহ করা হয়। এসব পণ্যের একটি বড় অংশ আকাশপথে ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারে পাঠানো হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বেশির ভাগ আকাশসীমা বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো কার্যত কার্যক্রমে ব্যাহত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে অন্যতম দুবাই কয়েক দিন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদসহ উপসাগরীয় প্রধান এয়ারলাইনস বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট বাতিল করেছে।
দক্ষিণ এশিয়া থেকে পণ্য পরিবহনে উপসাগরীয় এয়ারলাইনসের ওপর বড় নির্ভরতা রয়েছে। যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড এবং বিশেষায়িত মালবাহী উড়োজাহাজের মাধ্যমে বিপুল পণ্য পরিবহন করা হয়। বাংলাদেশের মোট এয়ার কার্গোর অর্ধেকেরও বেশি উপসাগরীয় হাব হয়ে পরিবাহিত হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৪১ শতাংশ। এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারে পাঠানোর পোশাক এখন ঢাকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিমানবন্দরে আটকে পড়ছে।
সমুদ্রপথেও ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপগামী অধিকাংশ কনটেইনার জাহাজ চলাচল করলেও সংঘাতের কারণে এই রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বা বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে ঘুরে চলতে হচ্ছে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বীমা খরচ বৃদ্ধি এবং সময়সূচির অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অনেক শিপিং লাইন নতুন বুকিং নেওয়ায় সতর্ক; কেউ কেউ সাময়িকভাবে বুকিং স্থগিত করেছে, আবার কেউ বিকল্প দীর্ঘ রুটে চার্জ বৃদ্ধি করেছে। ফলশ্রুতিতে রফতানিকারকদের কনটেইনার নিশ্চিত করা কঠিন হচ্ছে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ১০ শতাংশ আকাশপথে এবং ৪০-৫০ শতাংশ জাহাজে উপসাগরীয় রুটে পরিবহন করা হয়। সংঘাতের কারণে গালফ রুটও কার্যত বন্ধ। এখন আমাদের ভরসা প্যাসিফিক রুট। কিন্তু এতে খরচ ও সময় অনেক বেশি। এয়ার কার্গোতেও বহু ক্রেতা দ্রুত চালান চায়। সব মিলিয়ে এটি আমাদের জন্য বড় বিপর্যয়।”
রফতানি খাত ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের পণ্য রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.১৫ শতাংশ কমেছে। তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানি হয়েছে ২,৫৭৯ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩.৭৩ শতাংশ কম। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
ইপিবির মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাইয়ে রফতানিতে ২৪.৯০ শতাংশ বৃদ্ধি থাকলেও পরবর্তী সাত মাসে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। জানুয়ারি ২০২৬-এ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ০.৫০ শতাংশ, ফেব্রুয়ারি ১২.০৩ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা কমেছে ১০.৬৯ শতাংশ, নিষ্পত্তি কমেছে ৬.৭৯ শতাংশ।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা ঘনীভূত হবে। রেড সির কারণে সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াত বন্ধ। আগে কেপটাউন ঘুরে যেতে হতো, ফ্রেইট চার্জ বেড়ে যেত। এখনো সেই আশঙ্কা রয়েছে। যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তা শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকেও বড় ধরনের চাপ দেবে।

