বাংলাদেশে ব্যবহৃত ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম সৌদি আরব। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) দেশটিতে থেকে ছয় লাখ টন ডিএপি সার আমদানি করেছে। চলতি বছরও একই পরিমাণ আমদানি করার পরিকল্পনা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় এ আমদানি অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
মার্চ মাসে এক লট (৪০ হাজার টন) ডিএপি সার আনার কথা থাকলেও বিএডিসি তা স্থগিত করেছে। সরকারি সংস্থার দাবি, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় এ সময় আমদানির প্রয়োজন নেই। তবে বিএডিসির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে চীন ও মিসরের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরিয়ার পর ডিএপি সার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত জমি প্রস্তুতি ও বোরো চাষের শুরুতে প্রয়োজন হয়। চলতি বোরো মৌসুমে সরবরাহে তেমন সংকট দেখা না দিলেও জুনে আমনের মৌসুম শুরু হলে চাহিদা বেড়ে যাবে। সৌদি আরব থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকলে এবং বিকল্প উৎস থেকে যথাযথ সরবরাহ না আসলে ডিএপি সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ডিএপি সার মূলত জমি তৈরি করার সময় বেশি লাগে। সামনে আমন ও আউশ মৌসুম আসছে, তাই বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এতে সার ও সেচের জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, দাম বেড়ে যাচ্ছে। বোরো মৌসুমে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না, বেশি দামে কিনছেন, চাহিদার চেয়ে কম পাচ্ছেন। সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষির উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ১৫–১৬ লাখ টন ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) বছরে ১ লাখ টন উৎপাদন করে। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়, যার বেশির ভাগ করে থাকে বিএডিসি। কিছু আমদানিই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে হয়।
বিএডিসির ক্রয় বিভাগ জানায়, চলতি বছর (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) সংস্থাটি মোট ২৬ লাখ টন সার আমদানি করবে। এর মধ্যে ডিএপি রয়েছে ১১ লাখ ৭৬ হাজার টন, মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ৮ লাখ ৫৯ হাজার টন এবং ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সাড়ে ছয় লাখ টন।
বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব, চীন ও মরক্কো থেকে ডিএপি আমদানি করে। গত বছর চীন থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টন আমদানি করা হয়েছে। নন-ইউরিয়া সারের নিরাপদ মজুদের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের কোম্পানি মা’অ্যাদেনের সঙ্গে বছরে ছয় লাখ টন ডিএপি সার আমদানির চুক্তি করে বিএডিসি। যে চুক্তির অধীনে ২০২৫ সালে ছয় লাখ টন ডিএপি কিনেছে বিএডিসি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর সময়ে ছয় লাখ টন আমদানির কথা রয়েছে।
বিএডিসি জানায়, প্রতি মাসে ৪০ হাজার টনের একটি লট সৌদি আরব থেকে আসার কথা। বছরের মধ্যে ৪ লাখ ৮০ হাজার টন আগমী হলেও বাকি টন সার পরে কিনে ছয় লাখ টনের কোটা পূরণ করা হবে। তবে জানুয়ারির লট ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চের শুরুতে দেশে পৌঁছেছে। মার্চের লট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে; এপ্রিলে তা নেওয়া হবে। বিএডিসির মহাব্যবস্থাপক (ক্রয়) আহমেদ হাসান আল মাহমুদ বলেন, “চুক্তি মানেই সব সার নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় মার্চের লট নেওয়া হচ্ছে না। এপ্রিলে পুনরায় তা নেওয়া হবে।” মার্চের শুরুতে সৌদি থেকে এক লট ডিএপি দেশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ব্যবস্থাপক (পরিবহন) মোহাম্মদ খসরু নোমান।
দেশে ইউরিয়া সার উৎপাদন করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), আর ডিএপি, এমওপি ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) আমদানির দায়িত্বে থাকে বিএডিসি। ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) বছরে এক লাখ টন সার উৎপাদন করে, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ডিলারদের কাছে বিতরণ করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত থেকে সার আসে। কাতার ও আমিরাত থেকে মূলত ইউরিয়া, সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল জটিলতার কারণে সরকার বিকল্প উৎস থেকে বেশি পরিমাণে আমদানির চেষ্টা করছে। চীন ও মিসরের দেওয়া প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএডিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চীনের সঙ্গে বছরে ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি আমদানির চুক্তি ছিল। বর্তমানে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন চুক্তিতে বছরে ৩ লাখ ২০ হাজার টন ডিএপি আমদানি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
মিসর তিন লাখ টন করে ডিএপি ও টিএসপি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তিন লাখ টন টিএসপি নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে, তবে ডিএপি নিয়ে মৌখিক প্রস্তাবের কারণে আলোচনায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। এছাড়া দুবাইও দুই লাখ টন করে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, দেশে বর্তমান মজুদের পরিমাণ মে-জুন পর্যন্ত কৃষিকাজ চালাতে যথেষ্ট। মধ্যপ্রাচ্য সংকট সত্ত্বেও সারের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
৬ মার্চের তথ্যানুযায়ী, দেশে ৪ লাখ ৮১ হাজার টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন টিএসপি, ৪ লাখ ৭১ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৪৯ হাজার টন এমওপি মজুদ রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে ছয়টির মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, তবে টিএসপি ও ডিএপি কারখানা চালু রয়েছে।
ডিএপিএফসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) রবিউল আলম খান জানান, “বার্ষিক ১ লাখ ৪০ হাজার টন ডিএপি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ টন, যার মধ্যে ৪৮ হাজার টন উৎপাদিত হয়েছে।”
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বণিক জানান, “বর্তমানে দেশে সারের কোনো সংকট নেই। পরবর্তী মৌসুমেও যেন কোনো প্রভাব না পড়ে, তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।”

