দেশের বিভিন্ন জেলার ফসলের মাঠ থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা হয় নানা ধরনের সবজি। রাজধানীর শ্যামপুরের কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে এগুলো প্যাকিং করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কার্গো বিমানে করে এসব পণ্য মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হত। তবে চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থবির করে দিয়েছে।
আকাশপথে পরিবহন বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারে সবজি পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রপ্তানিকারক, কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। শুধু সবজি নয়, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত মাছ, বিস্কুট, নুডলস, ফ্রুট ড্রিংকস, পরোটা, সুগন্ধি চাল, চানাচুরসহ নানা কৃষিজাত পণ্যও বিদেশে পাঠানো যাচ্ছে না।
রপ্তানিকারকরা জানাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কোনো সবজি পাঠানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সংকটের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের অংশ প্রতিযোগী দেশের দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারির আট মাসে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। তবে ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি ৩৮ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) মোট রপ্তানি হয়েছিল আট কোটি ডলার। এর মধ্যে সৌদি আরবে এক কোটি ১৬ লাখ, ইউএইতে ৯৯ লাখ, কাতারে ৪১ লাখ ও কুয়েতে ৩১ লাখ ডলারের সবজি গিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি ও কানাডাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি হয়েছে।
শীত মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে দিনে ৩৫–৪০ টন সবজি রপ্তানি হয়। এর প্রায় ৪০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে যায়। ১৮০টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত এই রপ্তানি কার্যক্রম চালায় এবং মৌসুমি ফলমূলও পাঠায়।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে রিয়াদে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সবজি বাজারে পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস এয়ারলাইন্সসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে পণ্য পাঠানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রপ্তানিকারকরা জানান, গত শনিবার থেকে সবজি রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ বন্ধ। আকাশপথ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি উন্নতির সম্ভাবনা নেই। মোহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, “ফ্লাইট না থাকায় ইউরোপে আমাদের প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদি বিমানভাড়া বাড়ে, পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।”
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর জানিয়েছেন, টরন্টো, যুক্তরাজ্য ও ইতালিতে সামান্য কিছু পণ্য পাঠানো হচ্ছে, বাকি বাজারে রপ্তানি বন্ধ। প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ ডলারের রপ্তানি আটকে যাচ্ছে।
ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা তিন দিনেই ১০২টি। চট্টগ্রামের গ্রিন ওয়ার্ল্ড ইমপ্যাক্টের এক টন তাজা সবজি বাতিল হওয়া ফ্লাইটের কারণে নষ্ট হয়ে ১২০০ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও অনিশ্চয়তার কারণে নতুন চালান প্রস্তুত করতে পারছে না।
কৃষক ও রপ্তানিকারকরা বিপাকে
সংকট সরাসরি কৃষকের ওপর প্রভাব ফেলছে। নতুন অর্ডার বন্ধ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা কৃষকের কাছ থেকে সবজি সংগ্রহ বন্ধ করেছেন। তাহুরা ইন্টারন্যাশনালের ফয়েজ আহমেদ জানান, আগে প্রতিদিন ১৩ টন সবজি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতেন, এখন ক্রেতাদের অর্ডার না থাকায় সংগ্রহও বন্ধ।
শুধু সবজি নয়, হিমায়িত মাছ ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানিও প্রভাবিত হয়েছে। প্রাণ আরএফএল গ্রুপের ইলিয়াস মৃধা বলেন, প্রায় ২০০টি কনটেইনার আটকা পড়ে গেছে। স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের পাঁচ লাখ ডলারের পণ্যও বন্দরে আটকা।
প্রতিযোগী দেশ এগিয়ে
সংকটের সুযোগে ভারত ও পাকিস্তান সমুদ্রপথে দ্রুত পণ্য পাঠিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখল করতে পারে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে একই গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। দীর্ঘস্থায়ী রপ্তানি বন্ধ থাকলে বাংলাদেশের বাজার অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। দ্রুত পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড চেইন, বিশেষ কনটেইনার ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। মজিবুল হক বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে নতুন বাজারে নজর দেওয়া প্রয়োজন।” সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো দেশে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।

