দেশে কোন মাসে কত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আসবে তা প্রতি বছরের শুরুতেই নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এই পরিকল্পনাকে এলোমেলো করেছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতি মাসে গড়ে ১৫টি জাহাজের মাধ্যমে জ্বালানি তেল আমদানি করে। তবে চলতি মার্চে ১৬টি জাহাজ আসার কথা থাকলেও, শুক্রবার পর্যন্ত মাত্র ছয়টি জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে। এদিকে, মার্চে দেশে ৯টি এলএনজি জাহাজ আসার কথা থাকলেও, শুক্রবার পর্যন্ত এসেছে চারটি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর গত ১৪ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে এলএনজি, এলপিজি, গ্যাস অয়েল, এমইজি, বেস অয়েল ও এইচএসএফওসহ মোট ১৬টি জাহাজ এসেছে।
চলতি মাসে আরও পাঁচটি এলএনজি জাহাজ আসার কথা থাকলেও, এখন আসছে কেবল একটি। জ্বালানি তেল বোঝাই ৯টি জাহাজের মধ্যে নিশ্চিত এসেছে ছয়টি। এর ফলে চট্টগ্রামের পথে এখন সাতটি জাহাজ রয়েছে, অন্য সাতটির গন্তব্য অনিশ্চয়তায়। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আনা-নেওয়া হলেও, বাংলাদেশের এলএনজির ৮০ শতাংশই এই চ্যানেলের মাধ্যমে আসে। ইরানের বিধিনিষেধের কারণে জাহাজ চলাচলে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ হোসেন আজাদ জানান, বাংলাদেশ এলপিজি, ডিজেল, ফার্নেস তেল ও কনডেনসেট আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের মতো দেশেও আস্থা রাখে। তাই কোনো একটি অঞ্চলে সমস্যা হলেও বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু বলেছেন, মার্চে জ্বালানির কোনো সংকট হবে না। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি সংগ্রহ করা হবে। ইতিমধ্যেই দুই কার্গো জ্বালানি তেল স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছে।
এলএনজি আমদানির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের সিনিয়র ডিজিএম মো. নুরুল আলম জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে আল জোর ও আল জাসাসিয়া নামে দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে, যা এক লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি বহন করেছিল। এরপর লুসাইল ও আল গালায়েল নামে আরও দুটি জাহাজ বন্দরে এসেছে। চার জাহাজে মোট দুই লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। মার্চে মোট ৯টি জাহাজ আসার কথা থাকলেও চারটির বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ২৩ লাখ ৩৭ হাজার টন এলএনজি আমদানির শুল্কায়ন সম্পন্ন হয়েছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, কিছু জাহাজ অনিশ্চয়তার কারণে খোলাবাজার থেকে গত বুধবার দুইটি এলএনজি কার্গো বেশি দামে কেনা হয়েছে। গানভর কোম্পানি ২৮ ডলারে একটি কার্গো সরবরাহ করবে, আসার তারিখ ১৭ মার্চ। সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়ার কার্গো ২০ মার্চ দেশে পৌঁছাবে, প্রতি ইউনিট ২৪.৫ ডলারে। যুদ্ধ শুরুর আগে একই এলএনজি প্রতি ইউনিট মাত্র ১০ ডলারে কেনা হয়েছিল।
১৪ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ জাহাজের আগমন
চট্টগ্রাম বন্দরের ভেসেল অ্যারাইভাল লগ অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধ শুরুর পর বন্দরে এসেছে তেল ও গ্যাস বোঝাই মোট ১৫টি জাহাজ। প্রথম ধাপে কাতারের রাস লাফান থেকে আল জোর ও আল জাসাসিয়া নামের দুটি জাহাজ নোঙর করেছে, যা এক লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি বহন করছিল। ১০ ও ১১ মার্চ বন্দরে এসেছে আরও দুটি এলএনজি জাহাজ, আল গালায়েল ও লুসাইল।
ওমানের সোহর থেকে এলপিজি বোঝাই সেভান জাহাজ ৮ মার্চ বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া, ৫ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে ৫ হাজার ১৯ টন মনো-ইথিলিন গ্লাইকল নিয়ে বে ইয়াসু নামের একটি জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে।
সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার ২০৪ টন ডিজেল নিয়ে ১০ মার্চ বন্দরে এসেছে ‘শিউ চি’ নামের জাহাজ। একইসাথে সিঙ্গাপুর থেকে আসা দুটি জাহাজে এলএনজি ও এমইজি বোঝাই করে মোট ৪০ হাজার টন ফার্নেস তেল পৌঁছেছে। মালয়েশিয়া থেকে এলপিজি নিয়ে বন্দরে এসেছে মর্নিং জেন নামের আরেকটি জাহাজ।
বন্দরের পথে আরও ৭ জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরে আরও সাতটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। আফ্রিকার অ্যাঙ্গোলা থেকে ৫৮ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ২০ মার্চ নোঙর করার কথা রয়েছে সোনানগাল বেনগুয়েল নামের জাহাজটির। এই রুটে হরমুজ প্রণালির মতো কোনো ঝুঁকি নেই। ৩১ হাজার টন ডিজেল বোঝাই এসপিটি থেমিস নামের জাহাজ ইতিমধ্যেই ১২ মার্চ বন্দরে পৌঁছেছে। চলতি মাসে এলএনজি, এলপিজি, ডিজেল, ফার্নেস তেল এবং কনডেনসেটসহ মোট আটটি জাহাজ বন্দরে আসার শিডিউল রয়েছে।
তবে এলএনজি জাহাজগুলোর চারটি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় প্রতিনিধি ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেড জানায়, ১৪, ১৮, ২৬ ও ২৭ মার্চ দেশে আসার বুকিং থাকা চারটি এলএনজি জাহাজ কবে নাগাদ পণ্য আনবে তা এখন কেউ জানে না। এই চার জাহাজে মোট দুই লাখ ৪৫ হাজার টন এলএনজি আসার কথা ছিল।
ব্লুমবার্গের জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ‘লিব্রেথা’ নামের জাহাজটি কাতারের এলএনজি রপ্তানি কমপ্লেক্স থেকে ৬ মার্চ যাত্রা শুরু করেছে, তবে এখনও হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি। ‘ওয়াদি আল সেইল’ নামের আরেকটি জাহাজও হরমুজ প্রণালি পার হতে না পারায় এলএনজি লোড করতে সমস্যা হচ্ছে। এসবসহ তেল ও গ্যাস বোঝাই মোট সাতটি জাহাজ পণ্য নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

