গত এক দশকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই জটিলতায় ভরে উঠেছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু দেশীয় উৎপাদন সেই হারে বাড়েনি। গ্যাস উৎপাদনের ধীরগতি এবং একমাত্র তেল শোধনাগারের সীমিত সক্ষমতার কারণে বিদ্যুৎ, শিল্প, পরিবহন ও কৃষি খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং সীমিত আমদানি উৎসের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুসারে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। সব উৎস মিলিয়ে সরবরাহ বাড়ানো গেলেও তা ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি যাচ্ছে না। ফলে দৈনিক প্রায় ১৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতির প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতে। অনেক শিল্পকারখানা নিয়মিত গ্যাস সংকটে পড়ছে, কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতেও গ্যাসের স্বল্পতায় ভোগান্তি দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাস উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল ২০১৭ সালের দিকে। সে সময় কোনো কোনো দিন দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হতো। এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন কমতে শুরু করে। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। বাকি ঘাটতি পূরণ হচ্ছে এলএনজি আমদানি করে, যা দিনে ৮০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট পৌঁছাচ্ছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্র অনেক বছর ধরে উৎপাদনে থাকায় মজুত ধীরে ধীরে কমছে। নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি তুলনামূলক ধীর। এছাড়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে অনুসন্ধান কার্যক্রম দীর্ঘ সময় স্থবির ছিল। ফলশ্রুতিতে উৎপাদনের স্বাভাবিক প্রবণতা এখন নিম্নমুখী।
এদিকে বাংলাদেশের জ্বালানি সম্ভাবনার বড় অংশ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। কিন্তু সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় স্থবির। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে সমুদ্রের কোনো গ্যাসক্ষেত্র জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি। বিদেশি কোম্পানি আকৃষ্ট করতে কয়েক দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও সাড়া মেলেনি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান জোরদার না করলে ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে।
২০১৮ সাল থেকে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি শুরু করে। শুরুতে সীমিত পরিমাণ এলএনজি আনা হলেও পরবর্তীতে তা দ্রুত বেড়ে যায়। প্রথম বছরে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৪১ কার্গো এলএনজি দেশে আসে। পরে সরকার স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কিনতে শুরু করে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৫৬ কার্গো এবং স্পট মার্কেট থেকে ৫৩ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে, মোট ১০৯ কার্গো। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে এটি প্রায় ১১৫ কার্গোতে পৌঁছাতে পারে।
একটি কার্গো এলএনজিতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে। পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করলে এটি প্রায় ৩২৪ কোটি ঘনফুটের সমান। অর্থাৎ একটি কার্গো দেশের এক দিনের চাহিদা পূরণ করতে যথেষ্ট নয়। ফলে চাহিদা মেটাতে নিয়মিত এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হয়।
তবে এলএনজি আমদানির ফলে জ্বালানি ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। দেশীয় গ্যাসের তুলনায় এলএনজি অনেক ব্যয়বহুল এবং এর দাম পুরোপুরি আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২০–২৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা বছরের শুরুতে প্রায় ১০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। ফলে জ্বালানি আমদানিতে সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গ্যাসের পাশাপাশি তরল জ্বালানিতেও দেশের আমদানিনির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির প্রায় ৯২ শতাংশ বিদেশ থেকে আসে। দেশীয় উৎস থেকে আসে মাত্র ৮ শতাংশ। এই দেশীয় জ্বালানির বড় অংশ আসে গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে, যা থেকে উৎপন্ন হয় পেট্রোল ও অকটেন।
গত এক দশকে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্প্রসারণের কারণে জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট তরল জ্বালানির প্রায় ৫৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে পরিবহনে, ১৮ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে, ১৮ শতাংশ কৃষিতে এবং ৫ শতাংশ শিল্পখাতে। পণ্যভিত্তিক হিসাব করলে, ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, মোট পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির প্রায় ৬৭ শতাংশই ডিজেল।
দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ টন। অথচ দেশের মোট জ্বালানি চাহিদা এখন ৭০–৮০ লাখ টনের মধ্যে। ফলে অধিকাংশ জ্বালানি বিদেশ থেকে পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। এলএনজির ক্ষেত্রেও কাতার ও ওমানের মতো সীমিত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতা দেখা দিলে তা দ্রুত বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে; এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে চাপ সৃষ্টি হয়।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শাসসুল আলমের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রমে পর্যাপ্ত গতি না থাকায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জোরদার করা, সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান বৃদ্ধি, জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণ এবং সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

