বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের নাম ভিয়েতনাম। বিশ্ববাজারে এই দুই দেশের অবস্থান দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রধান রপ্তানিকারক হিসেবে চিহ্নিত। দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা নিয়েও তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছে। গত চার বছর টানা বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে।
গত বছর ২৭ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের চেয়ে তিনগুণ এগিয়ে থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ভিয়েতনামের অর্ধেক।
ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে এ অঞ্চলের দেশগুলো থেকে। অন্যদিকে, একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে। তবে ইউরোপে রপ্তানির এই সন্তোষজনক গতি ধরে রাখা ভবিষ্যতে কঠিন হতে পারে। কারণ ২০১৯ সালে ভিয়েতনাম ইইউর সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) সই করেছে। পরের বছর থেকে আংশিক শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর হয়, এবং আগামী বছর শতভাগ কার্যকর হলে ভিয়েতনামের রপ্তানি সুবিধা আরও বেড়ে যাবে। পাশাপাশি, ভিয়েতনাম সম্প্রতি ভারতের সঙ্গেও এফটিএ চুক্তি করেছে, যা ইউরোপে বাংলাদেশের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়াবে।
এদিকে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে মধ্যম উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের কারণে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। উত্তরণের পরবর্তী তিন বছর সুবিধা একই থাকবে, তবে মেয়াদ শেষ হলে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যে ৯ শতাংশ শুল্কারোপ হবে, যা ভিয়েতনামের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হলো তাদের পণ্যে উচ্চ মূল্য সংযোজন। এছাড়া ভিয়েতনামের লিড টাইম কম হওয়ায় ক্রেতার কাছে পণ্য দ্রুত পৌঁছে যায়। ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি ভালো থাকার মূল কারণ হলো শুল্কমুক্ত সুবিধা, যা এখনও বাংলাদেশকে এগিয়ে রেখেছে। তবে ভিয়েতনামের এফটিএ শতভাগ কার্যকর হলে বাংলাদেশের এই সুবিধা কমতে পারে।
ইইউর বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ইইউতে ২১.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। রপ্তানি হয়েছে ১,৯৪১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার মূল্যের পোশাক। এর আগে ২০২৪ সালে হিস্যা ছিল ২০.৭৮ শতাংশ। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, প্রতি বছর বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে।
ভিয়েতনামের ইইউর বাজারে রপ্তানি ৪.৮৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪.৫৩ শতাংশ। চীনের পরই ইইউতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তৃতীয় স্থানে আছে তুরস্ক, চতুর্থে ভারত।
২০২০ সালে ইইউ-ভিয়েতনাম এফটিএ কার্যকর হওয়ার পর দেশটির ৭১ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে শুরু করেছে। এতে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ১১.৩ শতাংশ। গত বছর ভিয়েতনামের রপ্তানি ৫০.৭ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশের ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশ ইবিএ স্কিমের কারণে অস্ত্র বাদে সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা উপভোগ করছে। ভারতও সম্প্রতি ইইউর সঙ্গে এফটিএ করেছে। চুক্তি কার্যকর হলে ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের হিস্যা ২০২৫ সালে ১০.৫৩ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৮২০ কোটি ডলার মূল্যের পোশাক। ভিয়েতনামের রপ্তানি ১,৬৭৫ কোটি ডলার, হিস্যা ২১.৫ শতাংশ। গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের হিস্যা ক্রমাগত বেড়েছে, বাংলাদেশের তুলনায় অনেক দ্রুত।
চীনের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেছে, ১৩.৬৬ শতাংশ। বাংলাদেশের পরে আছে ভারত (৬.৩৫%), কম্বোডিয়া (৬.২০%), এবং বাকি দেশগুলো যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হুন্ডুরাস।
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের হিস্যা ৬.৯০ শতাংশ, আগের বছরের ৭.৩৮ শতাংশের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ভিয়েতনামের হিস্যা বেড়ে ৬.০৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমছে, ভিয়েতনামের রপ্তানি বাড়ছে।

