মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বিঘ্নিত হয়ে এখন এক গভীর আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। টানা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একাধিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, আর অনেক জাহাজ ঝুঁকি এড়াতে প্রণালির দুই প্রান্তে আটকে রয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বিশ্বের বাজারে প্রবেশের প্রধান দরজা। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরল গ্যাসের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথের যেকোনো বিঘ্ন পুরো বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
ইরান প্রণালিতে বাধা দেওয়ার পর থেকেই জ্বালানি খাতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন জ্বালানি কোম্পানি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে, যা এ অঞ্চলের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
ইরাক, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশ, তাদের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে বাধ্য হয়েছে। বসরা অঞ্চলে দৈনিক তেল উৎপাদন ৩৩ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ৯ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। বিকল্প পথে সীমিত পরিমাণ তেল রপ্তানি করা হলেও তা মোট চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
সৌদি আরবও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। দেশটির সবচেয়ে বড় শোধনাগার বন্ধ করে দিতে হয়েছে, যা দৈনিক ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করত। বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল সরবরাহ করা হলেও এশিয়ার বাজারে সরবরাহ কমাতে হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের বড় শোধনাগার বন্ধ করে তেল পরিবহনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। তেলের দাম বেড়ে প্রায় ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে গ্যাসের বাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ কাতার উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চীন, ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো কাতার ও আমিরাত থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস আমদানি করে থাকে। এই সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে, যা অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন নিয়ম রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে কোনো দেশ বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। এমনকি যুদ্ধাবস্থাতেও নিরপেক্ষ জাহাজ চলাচলের অধিকার বজায় থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে এই পথ বন্ধ করে দেয় বা বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, যারা এই প্রণালির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, তাদের শক্ত অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ না হয়ে যায়। পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি সমুদ্রবন্দরগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি শুধু একটি আঞ্চলিক নৌপথ নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান শিরা। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। তাই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

