গত বছরের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বাড়ি, গাড়িসহ বড় ধরনের সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ‘সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ কাজ করে। তবে এই ইউনিটের জনবল মাত্র পাঁচজন, যা এত বড় পরিমাণ সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খুবই অপ্রতুল।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৫৩ একর জমি, ৭২টি বাড়ি, ১৪০টি ফ্ল্যাট, সাতটি ভবন, ৪০টি প্লট, ১০টি দোকান, ২৩৩টি গাড়ি, একটি ট্রাক, তিনটি জাহাজ, একটি অফিস স্পেস এবং একটি পার্ক ক্রোক করা হয়েছে। বিদেশে ৫৮২টি বাণিজ্যিক স্পেসও ক্রোকের তালিকায় রয়েছে। এছাড়া ৪ হাজার ৯৬০টি ব্যাংক হিসাব, ১৭টি সঞ্চয়পত্র, বিপুল পরিমাণ শেয়ার, ১৯টি বিও হিসাব, তিনটি বীমা পলিসি, নগদ অর্থ, সোনা ও বিদেশী মুদ্রাও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
দুদক সচিবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটে বর্তমানে একজন পরিচালক, দুজন উপপরিচালক, একজন সহকারী পরিচালক এবং একজন উপসহকারী পরিচালক রয়েছেন। এছাড়া একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, একজন অফিস সহায়ক, দুজন এএসআই ও একজন পিএ কর্মরত আছেন।
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রিসিভার নিয়োগ করে বাসার ভাড়া সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক থেকে আদায় করা হয়। আগামীতে ফাঁকা বাসাগুলো গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে পরিমাপ করে ভাড়া দেওয়া হবে।” বিধি অনুযায়ী, ক্রোক করা সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রিসিভার নিয়োগের প্রয়োজন হয়। আদালতের আদেশে ক্রোক ও রিসিভার নিয়োগ হয়। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা এসব আবেদন করেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরীর ১৬টি গাড়ি ক্রোক করা হয়। এ ছাড়াও এনা পরিবহনের ১৫৩টি যাত্রীবাহী বাস ক্রোক করা হয়েছে। মোট ২৩৩টি গাড়ি ক্রোক করার পরও এসব গাড়ির জন্য রিসিভার নিয়োগ করা হয়নি। রিসিভার নিয়োগকৃত গাড়িরও whereabouts সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জানুয়ারি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা শামসুল হক রাজুর একটি গাড়ির রিসিভার নিয়োগ করা হয়। কিন্তু গাড়িটি দুদক এখনও বুঝে পায়নি। ২৩৩টি ক্রোক করা গাড়ির মধ্যে এনা পরিবহনের ১৫৩টি বাস ও জান্নাত আরা হেনরীর ১৬টি গাড়ি রয়েছে। রিসিভার নিয়োগ না থাকায় এসব গাড়ির আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে না।
দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা উপপরিচালক সাইদুজ্জামান এনা পরিবহনের ১৫৩টি বাসের রিসিভার নিয়োগের জন্য আবেদন করেছেন। তবে আদালতের আদেশ এখনও পাওয়া যায়নি। একইভাবে, গত ১২ জানুয়ারি সাবেক সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরীর জমি, ফ্ল্যাটসহ ৪৫টি স্থাবর সম্পত্তি ও ১৬টি গাড়ি ক্রোক করা হয়। প্রায় ৫৭ কোটি টাকা ১৯টি ব্যাংক হিসাবসহ চার কোম্পানির ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা যৌথ মালিকানা অবরুদ্ধ করা হয়। কিন্তু গাড়িগুলোর কোথায় রাখা হয়েছে সে তথ্য নেই দুদকের কাছে।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর জান্নাত আরা হেনরী গ্রেফতার হন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২৩ ডিসেম্বর দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই মামলায় ১৩ জানুয়ারি তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম বলেন, “অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের সরজমিন পরিদর্শন করে সম্পদের সঠিকতা যাচাই করতে হয়। এরপর ক্রোকের আবেদন করা উচিত। রিসিভার নিয়োগের জন্যও তারা আবেদন করে থাকেন। সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট থাকলেও এত বড় পরিমাণ সম্পদ রিসিভার নিয়োগ ছাড়াই থাকাটা প্রশ্নবিদ্ধ।” দুদক বর্তমানে ক্রোক করা সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করছে।
একজন দুদক কর্মকর্তা জানান, “ক্রোক করা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ এখন জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মকর্তার নিয়োগ নেই। অনুসন্ধান-তদন্তকারীদের মাধ্যমে কাজ চলছে। শুধু হিসাব রাখাই মূলত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের দায়িত্ব। কিন্তু সম্পদ নষ্ট বা বেহাত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যথাযথ লোকবল বা ব্যবস্থা নেই।” তারা আরও বলেন, ফ্রিজ বা ক্রোক আদেশ দ্রুত তদন্তকারীর হাতে দেওয়া উচিত। আদালতের আদেশ পাওয়ার সময় অনেক যায় যায়, আর ততক্ষণে অপরাধীরা টাকা সরিয়ে নেয়। ফ্রিজের মেয়াদও বাড়ানো দরকার। সাধারণত ছয়-সাত মাসের মধ্যে অ্যাকাউন্ট আনফ্রিজ হয়ে যায়।

