গত বছরের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচার বিভাগেও সংস্কারের হাওয়া লাগে। বিশেষ করে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুপারিশ এড়াতে উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বেশ কিছু অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিচারক নিয়োগে এবারই প্রথম ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠিত হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্দিষ্ট আইন তৈরির দাবি ছিল, যা এতদিন কার্যকর হয়নি। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকার এই কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া চালু করে।
এরইমধ্যে হাইকোর্টে বিচারক হতে আগ্রহী প্রার্থীদের থেকে প্রায় ৩০০টি আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে বাছাই করে ৫৯ জনের মৌখিক পরীক্ষা নিয়েছে কাউন্সিল। তাদের মধ্য থেকে উত্তীর্ণদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে আইন মন্ত্রণালয় গেজেট আকারে তা প্রকাশ করবে। সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন জানান, নির্বাচিত প্রার্থীদের তালিকা এখন কাউন্সিল চূড়ান্ত করবে। এরপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে নিয়োগ কার্যকর হবে।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তৃতীয় শ্রেণির নম্বর বাদ দেওয়া হয়েছে। সরাসরি ভাইভা নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি নিজেই। বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট অনেকে এটিকে ‘বিচারক নিয়োগে নতুন দিগন্ত’ হিসেবে দেখছেন। সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মত তাদের।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, “হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগে অবশ্যই সৎ, মেধাবী, দক্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্নদের নির্বাচন করতে হবে।” বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “এই পদে এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে, যার সততা প্রশ্নাতীত এবং যিনি নিজে কিছু লিখতে সক্ষম।”
তিনি আরও জানান, আগের নিয়োগ নিয়ে অনেকের মতো তাঁরও মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল, যা তিনি আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে জানিয়েছেন। কাজল বলেন, “নতুন অধ্যাদেশের আওতায় নিয়োগ হলে সেটি হবে বেশি যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে। গত মাসে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে আমি অনুরোধ করেছি যেন ভবিষ্যৎ নিয়োগে মর্যাদার সঙ্গে মানানসই ব্যক্তিদের বাছাই করা হয়।” তিনি সততার পাশাপাশি লেখার যোগ্যতাকে বিচারকের গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে দেখেন। তাঁর ভাষায়, “যিনি ‘মাই লর্ড’ উপাধি পাবেন, তিনি যেন সত্যিকার অর্থে সেই মর্যাদার যোগ্য হন।”
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. পারভেজ হোসেন অভিযোগ করেন, আবেদনকারীদের মধ্যে ৫৩ জন অ্যাডভোকেট ও ১৩ জন জেলা জজকে ডাকা হলেও, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস কোর্স করা অনেক যোগ্য প্রার্থীকে ডাকা হয়নি। গাইডলাইন ছাড়াই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে, জবাব না পেলে তারা আইনি ব্যবস্থা নেবেন।
২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ‘সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ’-এর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এতে সাত সদস্যবিশিষ্ট ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠিত হয়। ২৮ মে এই কাউন্সিল গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিচারপতি হতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের আবেদন আহ্বান করে। বাছাই শেষে কাউন্সিল ৫৯ জনকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকে। এর আগে, ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর ২৩ জন অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দেয় সরকার। আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তাদের মেয়াদ হবে শপথ নেওয়ার দিন থেকে দুই বছর। সংবিধানের ৯৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এই নিয়োগ দেন।
ছাত্র ও জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ সংস্কারে নানা উদ্যোগ নেয়। একটি বিশেষ কমিশন গঠন করে সুপারিশও করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠন
- প্রধান বিচারপতি ছাড়া অন্য বিচারকের নিয়োগে আলাদা কমিশন
- সব বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ
- জেলা পর্যায়ে বাণিজ্যিক আদালত
- উপজেলায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত
- স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা
বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা ৯০ জন। বিচারাধীন মামলা ৫ লাখ ৯৯ হাজার ১২৬টি। আপিল বিভাগে মামলা রয়েছে ৩৪ হাজার ৯৮১টি। সংখ্যাগুলো বিচারক সংকট এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির প্রমাণ দিচ্ছে।

