তখন দুপুর ১২টা ৩ মিনিট। ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের তৃতীয় তলায় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১–এর এজলাস কক্ষ থেকে বের হন অশীতিপর ইদ্রিস শেখ। পুলিশের একজন সদস্য তাঁর ডান হাত ধরে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান। ডান হাতে ধরা লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে নামা ছিল তাঁর জন্য কঠিন এক পরীক্ষা।
পরিস্থিতি বুঝে আরও দুই পুলিশ সদস্য এগিয়ে এসে তাঁর দুই বাহু ধরে সহায়তা করেন। এভাবে কষ্ট করে দ্বিতীয় তলায় নামানো হয় ইদ্রিস শেখকে। হাঁপাচ্ছিলেন তিনি, এরপর আরও এক দফা সহায়তা নিয়ে তিনি নিচতলায় নামেন। পুরোটা সময় লেগে যায় প্রায় পাঁচ থেকে সাত মিনিট।
প্রিজন ভ্যানে ইদ্রিস শেখ। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে।
নিচতলার হাজতখানার সামনে পৌঁছাতেই ছেলের চোখের পানি আর ধরে রাখা গেল না। বাবুল শেখ চিৎকার করে বলেন, ‘আমার বাবার বয়স ১২০ বছর। এই বয়সেও তাঁকে জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে!’
মামলার নথি অনুযায়ী, ইদ্রিস শেখ মাদারীপুরের রাজৈর থানার শেখেরটেক এলাকার বাসিন্দা। ২০০৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে স্থানীয় দুই পক্ষ—শামসুল হক হাওলাদার ও সিরাজুল হক মোল্লার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে গুলিতে সৈয়দ আলী ও সুলেমান মোল্লা নিহত হন এবং আহত হন আরও ৩০ জন।
ঘটনার পর মামলা হয় রাজৈর থানায়। ওই বছর আগস্টে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে ইদ্রিস শেখসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়। আদালত ২০০৫ সালের ১০ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করেন। ২০১০ সালে মামলাটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। বিচার শেষে ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেন বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন। রায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন ও ইদ্রিস শেখসহ নয়জনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ইদ্রিস শেখের বিরুদ্ধে গুরুতর জখমের অভিযোগ ছিল। রায়ের সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
প্রিজন ভ্যানে ইদ্রিস শেখকে সহায়তায় পুলিশ সদস্য। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে।
গতকাল মঙ্গলবার ইদ্রিস শেখসহ সাতজন আত্মসমর্পণ করেন। এরপর আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালত প্রাঙ্গণেই বাবুল শেখের চোখে জল। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স ৭০ বছর। আমরা পাঁচ ভাই–বোন ছিলাম। তিন ভাই আগেই মারা গেছে। আমার বাবার বয়সী কেউ এলাকায় নেই। এতদিন ধরে তিনি এই মামলার বোঝা টানছেন।’
ইদ্রিস শেখের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম জানান, হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল থাকলেও তাঁদের মক্কেল আপিল করতে চান। কারাগার থেকেই জেল আপিল করবেন তিনি।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। বাবুল শেখ বারবার হাজতখানার সামনে ঘোরাঘুরি করেন। কখন তাঁর বাবাকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হবে, সেই অপেক্ষা। বিকেল পাঁচটার পর তিনি দেখেন, কোনো প্রিজন ভ্যান নেই। দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তবে পুলিশ জানায়, ইদ্রিস শেখ এখনো হাজতখানায়।
সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে হাজতখানার সামনে আসে একটি প্রিজন ভ্যান। পুলিশ সদস্যরা বৃদ্ধ ইদ্রিস শেখকে ধরে ধরে ভ্যানে তোলেন। এ সময় ছেলে বাবুল শেখ বাবার হাতে একটি চিরকুট দেন। বৃদ্ধ বাবা সেটি গ্রহণ করে কাঁদতে থাকেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোরা ভালো থাকিস। কোর্টে আমার জামিনের আবেদন করিস শিগগিরই।
বৃদ্ধ বাবা প্রিজন ভ্যানের ভেতরে, তাঁকে দেখার চেষ্টায় ছেলে বাবুল শেখ।
বাবার কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে বাবুল শেখ বলেন, ‘আব্বা, চিন্তা কইরো না। উকিলের সঙ্গে কথা বলব। তোমার জামিনের জন্য আবেদন করব।’ ইদ্রিস শেখ যখন প্রিজন ভ্যানে উঠে বসেন, তখন ভ্যানে থাকা অন্য বন্দীরা তাঁকে ধরে বসতে সাহায্য করেন। লোহার ফাঁক দিয়ে ছেলে বাবুলের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। দুজনেই তখন চোখের জলে ভিজে যান।
এরপর প্রিজন ভ্যানটি রওনা হয় কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশে। ছেলের চোখে তখন অশ্রু। এলাকার একজন এসে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিচারিক আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুর রশিদ মোল্লা বলেন, ‘ইদ্রিস শেখ বলেছেন তাঁর বয়স ১২০ বছর। এত না হলেও হয়তো তাঁর বয়স ১০০–এর কাছাকাছি।