এই পেশায় কর্ম জীবনে ভারসাম্য নেই। আছে শুধু কাজ, সেটাই জীবন।” দিল্লি হাইকোর্টের বিদায়ী বক্তব্যে এমন মন্তব্যই করেছিলেন বিচারপতি বিভু বাখরু। তার এই বক্তব্য ভারতের হাজার হাজার আইনজীবীর বাস্তব জীবনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিশেষ করে মামলা পরিচালনায় যুক্ত আইনজীবী ও বড় বড় আইনি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা পেশাজীবীদের জীবনে ৮০ ঘণ্টারও বেশি কাজ, সপ্তাহান্তে অফিস এবং রাতের খাবারের পর ড্রাফটিং এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
কর্ম-জীবনে ভারসাম্য মানে শুধু কম কাজ নয়। এটি এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে কাজ ব্যক্তি জীবনের সম্পর্ক, বিশ্রাম, শখ, এমনকি মানসিক সুস্থতার ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়ায় না। প্রচলিত প্রবাদ যেমন বলে, “জীবিকা গড়তে গিয়ে যেন জীবনটা ভুলে না যাই।”
আইনজীবীরা সাধারণত দৃঢ় মনোবল, প্রতিশ্রুতিশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত বলে পরিচিত। কিন্তু এই বহিরঙ্গের আড়ালে রয়েছে ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ ও স্বাস্থ্যহানির গোপন চাপ। নানা গবেষণায় দেখা গেছে, ভারসাম্যহীন কাজের পরিবেশ বৈবাহিক অশান্তি, হতাশা, উদ্বেগ ও হৃদরোগ পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে নারী আইনজীবীদের মধ্যে পেশাগত অস্বস্তি ও বার্নআউটের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। এটি স্পষ্টভাবে একটি লিঙ্গ-সংবেদনশীল নীতির অভাবকে নির্দেশ করে।
যখন আইনজীবীরা ক্লান্ত ও মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে পড়েন, তখন ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। নৈতিকতা দুর্বল হয়, ক্লায়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হন। এমনকি পুরো বিচার ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যেমন বলা হয়, “যে মোমবাতি দুই দিক থেকে জ্বলে, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।”
- প্রথমত, এখানে রয়েছে ‘বিলযোগ্য ঘণ্টা’র ত্রাস। কঠোর বিলিং টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী ক্লায়েন্ট, কোর্টের সময়সীমা ও জরুরি ফাইলিংয়ে কর্মঘণ্টা অসীম। ছুটি মাঝপথে বাধাগ্রস্ত হয়, সপ্তাহান্ত উধাও হয়ে যায়। রাতের খাবারের সময়ও ইমেইল চেক করতে হয়, ফোন বেজে ওঠে মধ্যরাতেও।
- দ্বিতীয়ত,অতিরিক্ত কাজ করা গৌরব মনে করার সংস্কৃতি। সবচেয়ে আগে অফিসে আসা এবং সবচেয়ে পরে ফেরা মানেই যেন সবচেয়ে দায়িত্ববান কর্মী। অথচ এর পেছনে রয়েছে মূল্যবান জীবনের ক্ষয়। ভারতে ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত জরিপগুলোতে দেখা যায়, ৬০ শতাংশের বেশি আইনজীবী বার্নআউটের শিকার। অনেকেই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ফার্ম ছেড়ে চলে যান।
উদ্বেগ, বিষণ্নতা, নিদ্রাহীনতা ও আসক্তি—এসব সমস্যা আইন পেশায় অন্যান্য পেশার তুলনায় বেশি। অথচ মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনো এক ধরনের নিষিদ্ধ বিষয়। সাহায্য চাওয়ায় লজ্জা, বিশ্রাম নেওয়ায় অপরাধবোধ—এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন। ভারতের শ্রম আইনগুলো আইনজীবীদের সুরক্ষা দিতে পারে না। অধিকাংশ কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ আইন তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং ‘ফ্লেক্সিবল’ চুক্তির নামে এসব নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম, ‘ওয়েলনেস ইনিশিয়েটিভ’ বা ‘রাইট টু ডিসকানেক্ট’ অধিকাংশ ফার্মেই অনুপস্থিত।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক আইন ফার্ম ব্যাপক পদত্যাগের মুখে পড়ে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। টাইমশিটে নমনীয়তা, অতিরিক্ত কাজের পর বিশ্রাম দিবস নির্ধারণ এবং সপ্তাহান্তে অফিস বন্ধ রাখার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কর্মী বাঁচলো, মনোবল বাড়লো। আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন এমনকি ‘ছুটি নেওয়ার জন্য বিলযোগ্য ঘণ্টা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। স্পেনেও ‘কাজের পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার অধিকার’-এর মতো আইন প্রণয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
আইনি পেশায় ভারসাম্যের নতুন দিগন্ত:
- সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন: কেবল বিনব্যাগ বা যোগাসনের আয়োজন নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা, নমনীয় সময়সূচি এবং বার্নআউট নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
- বিশ্রামের প্রণোদনা: শুধু অনুমতি নয়, বিশ্রামকে পুরস্কৃত করতে হবে। সুপরিকল্পিত বিশ্রাম দীর্ঘমেয়াদে কর্মদক্ষতা বাড়ায়।
- ফ্লেক্সিবিলিটি ও নিয়ন্ত্রণ: আইনজীবীদের নিজ নিজ সময়, কেসলোড ও ক্যারিয়ার প্ল্যানের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। হাইব্রিড ও স্বল্প-ঘণ্টার মডেল কার্যকর হতে পারে।
- সম্পূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা: মেন্টরশিপ, থেরাপি, পিয়ার সাপোর্ট, ফিটনেস ও মেডিটেশন—সবই আইনি পেশার অংশ হওয়া উচিত।
- লিঙ্গ সংবেদনশীল সংস্কার: মাতৃত্বকালীন ছুটি, নমনীয় সময়সূচি ও লিটিগেশনে নারী আইনজীবীদের সহায়তা অপরিহার্য।
এছাড়া, আইনি শিক্ষাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। আইন শিক্ষালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মানসিক স্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও টেকসই পেশাগত জীবনচর্চা নিয়ে শিক্ষা দিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে বুঝিয়ে দিতে হবে—সফলতা মানেই ক্লান্ত হয়ে পড়া নয়।
কর্ম-জীবনে ভারসাম্যে কোনো বাড়তি সুবিধা নয়। এটি সৎ ও কার্যকর বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যেমন বলা হয়, “ফাঁকা কাপ থেকে কেউ কিছু ঢালতে পারে না।” সুস্থ, বিশ্রামপ্রাপ্ত ও সমর্থ আইনজীবীই তাদের ক্লায়েন্ট ও সংবিধানকে ঠিকভাবে সেবা দিতে পারেন।

