আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া পাঁচ পৃষ্ঠার এক জবানবন্দিতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন, গুম-খুন, র্যাবের ভূমিকা এবং আন্দোলন দমন নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন মামুন। এরপর চলতি বছরের ২৪ মার্চ ঢাকার একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনি স্বেচ্ছায় এই জবানবন্দি দেন। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের খাস কামরায় তাকে বিশ্রাম ও চিন্তার জন্য আড়াই ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় জবানবন্দি রেকর্ড।
পুলিশের ভেতরে গোপালগঞ্জ বলয় ও দ্বন্দ্ব:
চৌধুরী মামুন দাবি করেন, তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু গোপালগঞ্জভিত্তিক প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছিলেন। এজন্যই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তাকে সততা, দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেন। বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব যেন প্রকাশ্যে না আসে, এ কারণেই তাকে পরপর দুই দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

তার ভাষায়, ২০১৪ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক বলয় গড়ে ওঠে। অনেক কর্মকর্তা রাজনৈতিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে ওঠেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়েও তিনি এমন প্রভাবিত কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘রাতের ভোট’ পরিকল্পনা:
সাবেক আইজিপি জানান, নির্বাচনের সময় তিনি ছিলেন ডিআইজি (ঢাকা রেঞ্জ)। সেই সময়কার আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী রাতে ভোটব্যালটে অর্ধেক ভোট আগেই ঢুকিয়ে রাখার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রীকে—এমনটা শুনেছেন বলে উল্লেখ করেন মামুন। তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশেই জেলা প্রশাসন, ডিসি, ইউএনও, এসপি, ওসি পর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় রাতের ভোট কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে বিপিএম-পিপিএম পদক বাছাইয়েও এসব কর্মকর্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো।
র্যাবে গুম ও নির্যাতন ছিল সংস্কৃতি:
২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মামুন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরায় র্যাব-১ কম্পাউন্ডে অবস্থিত টিএফআই সেলসহ বিভিন্ন র্যাব ইউনিটে গোপন বন্দিশালা চালু ছিল। সরকারের বিরোধী মতাবলম্বীদের তুলে এনে সেখানে নির্যাতন, জিজ্ঞাসাবাদ এবং গোপনে আটকে রাখা হতো।
এসব কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করতেন র্যাবের এডিজি (অপারেশন) ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকরা। গুম বা ‘ক্রসফায়ার’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা আসত সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে—এমনটিও মামুন দাবি করেন। তিনি নিজে কখনো এমন আদেশ পাননি বলেও জানান।

ব্যারিস্টার আরমানকে আটকের বিষয়ে জানতেন:
মামুন বলেন, ব্যারিস্টার আরমানকে টিএফআই সেলে আটক রাখা হয়েছে—এ বিষয়ে তাকে অবহিত করেছিলেন তার পূর্বসূরি বেনজীর আহমেদ। এ ছাড়া র্যাবের গোয়েন্দা পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেমও বিষয়টি জানিয়ে দেন। তবে মামুনের সময় আরমানকে আটক করা হয়নি বলেও তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
আন্দোলন দমন ও ‘মারণাস্ত্র ব্যবহারে’ নির্দেশ:
সাবেক আইজিপি জানান, জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সরকারের উচ্চপর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হতো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় অনুষ্ঠিত এসব বৈঠকে তিনি নিজেও অংশ নিতেন। সেখানে র্যাব, পুলিশ, এসবি, ডিজিএফআই, এনটিএমসি, বিজিবি ও আনসারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থাকতেন।
একটি বৈঠকে আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের আটক ও নির্যাতনের সিদ্ধান্ত হয়, যা বাস্তবায়ন করেন ডিবি প্রধান হারুন ও ডিজিএফআই কর্মকর্তারা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘জ্বিন’ খেতাব পাওয়া হারুন ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী, যার নির্দেশ ডিএমপি ও ডিবি সরাসরি অনুসরণ করতো। ডিএমপি কমিশনার হাবিব ১৮ জুলাই প্রকাশ্যে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করার নির্দেশ দেন। মামুন বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা—যেমন আইনমন্ত্রী, তাপস, ওবায়দুল কাদের, ইনু ও মেনন—মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি দিয়েছেন।
র্যাব কর্মকর্তাদের ভূমিকায় সেনা গোয়েন্দার সম্পৃক্ততা:
মামুন জানান, র্যাবের অভ্যন্তরে গুম ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে মিলিটারি অফিসারদের ভূমিকাই বেশি ছিল। জেনারেল তারিক সিদ্দিকীর নির্দেশেই এসব কার্যক্রম পরিচালিত হতো। আইজিপি থাকা অবস্থায়ও এসব বিষয়ে তাকে অবহিত করা হতো না। তিনি বলেন, ‘আলেপ উদ্দিনসহ কিছু কর্মকর্তা গুম ও নির্যাতনে “বিশেষ দক্ষতা” দেখিয়ে র্যাবের মধ্যে কুখ্যাতি অর্জন করেন।’ এসব কর্মকাণ্ডে পুলিশ অফিসারদের প্রভাব সীমিত ছিল।
সরকার পতনের প্রাক্কালে ‘শেষ চেষ্টা’:
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী, তার বোন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ৫ আগস্টের গণজমায়েত কীভাবে দমন করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা হয়।
পরদিন সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। কিন্তু দুপুরের মধ্যে দেখা যায়, সেনাবাহিনী আন্দোলনকারীদের বাধা দিচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পক্ষ নিচ্ছে। আইজিপি জানান, দুপুরেই তিনি বুঝতে পারেন সরকার পতন আসন্ন। এরপর বিকেলে হেলিকপ্টারে করে তেজগাঁও বিমানবন্দর হয়ে সেনা অফিসার্স মেসে আশ্রয় নেন।
অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী সাবেক আইজিপি:
সাবেক পুলিশ প্রধান বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে পুলিশের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, গুলি, নির্যাতন ও গুমের ঘটনায় আমি অনুতপ্ত ও লজ্জিত। সাবেক আইজিপি হিসেবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবসময় চেষ্টা করেছি সততা ও আইন মেনে দায়িত্ব পালনের। কিন্তু দেশের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতার মুখে ফেলেছে। বিবেকের তাড়নায় আমি এই জবানবন্দি দিচ্ছি।

