অভিযোগটা শুনলে মনে হবে, যেন সিনেমার কাহিনি। কিন্তু এটি বাস্তব—এ দেশের সরকারি ব্যাংকের অর্থ লোপাটের বাস্তবচিত্র। জামানত ছাড়াই এক ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ৩০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ফের আলোচনায় বেসিক ব্যাংক।
এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি নতুন মামলা দায়ের করেছে। আসামির তালিকায় রয়েছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক বহুল আলোচিত চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু, সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১৭ জন।
২০১৩ সালের মার্চে “ফোর এস স্টিল” নামের একটি কোম্পানি গঠিত হয়। মাত্র তিন দিন পরে, প্রতিষ্ঠানটি গুলশান শাখায় হিসাব খুলে বসে। এরপর সঙ্গে সঙ্গেই ৫০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন! প্রতিষ্ঠানের মালিক মাসুদ রানা বাড্ডা এলাকায় কিছু জমির কাগজ মর্টগেজ রাখার অঙ্গীকার করেন, যদিও জমির প্রকৃত মূল্য কিংবা আইনি বৈধতা নিয়ে তখনই প্রশ্ন ছিল।
তবুও গুলশান শাখার শাখা ব্যবস্থাপক শিপার আহমেদ ঋণ প্রস্তাবটি দ্রুত পাঠিয়ে দেন প্রধান কার্যালয়ে, উপেক্ষা করে ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটির আপত্তি ও নানা ঝুঁকির কথা।
২৮ এপ্রিল ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ঋণ না দেওয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু সব কিছু অগ্রাহ্য করে ১০ জুন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩২৩তম সভায় এই ঋণ প্রস্তাব তোলা হয়। উপস্থিত ছিলেন শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুসহ ৯ জন পরিচালক। তারাই শর্তসাপেক্ষে ৩০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে দেন।
তবে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—এই পুরো প্রক্রিয়াতেই ব্যাংকিং নীতিমালার চরম লঙ্ঘন হয়েছে। জামানত নেই, যাচাই-বাছাই নেই, অথচ কোটি কোটি টাকার ঋণ চলে গেছে এক নামমাত্র কোম্পানির হাতে।
মামলায় শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু ও এমডি ফখরুল ইসলাম ছাড়াও আসামি করা হয়েছে পরিচালক, কোম্পানি সচিব, শাখা ব্যবস্থাপক, ঋণ কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক মাসুদ রানা এবং এমনকি তার স্ত্রীকেও।
২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো নিয়ে একের পর এক মামলা হলেও, দীর্ঘদিন বাচ্চুর নাম বাদ পড়েছিল। দুদক তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের জুনে তাকে ৫৮টি মামলার চার্জশিটে যুক্ত করা হয়।
এছাড়াও ২০২4 সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৪৮ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগে তার ও পরিবারের বিরুদ্ধে চারটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে কানাডায় ৫৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
এই ঘটনার পরে বারবার প্রশ্ন ওঠে—একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ভেতরে এমন বড় অর্থ লোপাট কীভাবে হয়, কার ছত্রচ্ছায়ায় হয়, আর কেনই বা এত দেরিতে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়?

