আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাতের ভোটের অভিযোগ ঠেকাতে নতুন কৌশল নিচ্ছে সরকার। এবার ভোটের দিন সকালেই ব্যালট পেপারসহ সব নির্বাচনী সরঞ্জাম ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হবে। তবে আগের দিনই সেগুলো পৌঁছে যাবে জেলা, উপজেলা ও নির্বাচনী এলাকাগুলোর নিরাপদ গন্তব্যে।
নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখতে এবার সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য বডিওর্ন ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলো এসেছে গত ৯ জুলাই যমুনায় অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাচন প্রস্তুতি ও সংস্কার সংক্রান্ত বৈঠক থেকে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানকার কার্যবিবরণী থেকে এই তথ্য জানা গেছে। প্রধান উপদেষ্টা এর আগেই ঘোষণা করেছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালট পাঠানোর পর কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে। সেই প্রেক্ষিতে এবার সকালেই ব্যালট পাঠানোর সুপারিশ করেছে নির্বাচন সংস্কার কমিশন। বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নির্বাচনকালীন ১৫ দিন নির্দিষ্ট যানবাহন ছাড়া অন্য সব ধরনের পরিবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। এতে পড়বে ট্যাক্সিক্যাব, মাইক্রোবাস, পিকআপ, ট্রাক, লঞ্চ ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান। এছাড়া নির্বাচনের সময় নির্বাচনী এলাকায় ৭ দিন মোটরসাইকেল চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
নিরাপত্তা বাহিনীতে দ্রুত নিয়োগ: প্রধান উপদেষ্টা পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীতে দ্রুত ১৯,২৯২ সদস্য নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে থাকবে—
- পুলিশ: ১১,০০০
- বিজিবি: ৫,৫১৩
- কোস্টগার্ড: ৬৩৪
- আনসার: ২,১৪৫, এই নিয়োগ দ্রুত শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
ডিসি, এসপি, ইউএনও ও ওসিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লটারির মাধ্যমে বদলি করা যায় কি-না, তা বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশনকে।
প্রধান উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে ২৫টি প্রস্তুতিমূলক নির্দেশনা দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রস্তুতি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ৩ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গণি এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেন।
বাজেটে বরাদ্দ: অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম কেনার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
- নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ: ২,০৮০ কোটি টাকা
- অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের খাতে বরাদ্দ: ২০,০০০ কোটি টাকা
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আগেই বলেছেন, “নির্বাচনের অর্থ বরাদ্দ দিতে কোনো কার্পণ্য করবে না সরকার।”
প্রশিক্ষণ ও সেনা মোতায়েন: ৮ লাখ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে থাকবে:
- পুলিশ: ১,৪১,০০০
- অস্ত্রধারী ও লাঠিসহ আনসার-ভিডিপি: ১,৪১,০০০
- গ্রাম পুলিশ ও দফাদার: ৯৪,০০০
এছাড়া নির্বাচনে ৬০,০০০ সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবে, জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ।
নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও সেনা মোতায়েন:
- প্রত্যেক রিটার্নিং অফিসারকে নিরাপত্তা সেল গঠন করতে হবে
- তিনি জেলা বা বিভাগীয় নিরাপত্তা কমিটির পরামর্শে পরিকল্পনা তৈরি করবেন
- প্রয়োজনে ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’ অনুযায়ী সেনা মোতায়েন করা হবে
নির্বাচনকালে জনসাধারণ ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য গাইডলাইন (ম্যানুয়াল) তৈরি করা হবে। দায়িত্বে থেকেও কেউ অনিয়মে জড়ালে তাৎক্ষণিক বিচার ও ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করতে হবে। ১৮-৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটারদের জন্য পৃথক বুথ ও সহায়ক ব্যবস্থা এবং নারী ভোটারদের জন্য পৃথক বুথ রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে।
ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকা:
- প্রতিটি জেলায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে মোবাইল কোর্ট টিম গঠন হবে
- তারা ভোটের আগে-পরে সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে মাঠে থাকবেন
- রিটার্নিং অফিসারের চাহিদায় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োগ করা হবে
অস্ত্র ও সহিংসতা দমন:
- তফসিল ঘোষণার পর ১৫ দিন বৈধ অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ থাকবে
- অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও সহিংস সামগ্রী উদ্ধারে অভিযান চালাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

