মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারকে দেওয়া এককালীন অনুদান ও মাসিক ভাতার অর্থ স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মায়ের মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করার নতুন বিধিমালা জারি করেছে।
সরকারি সহায়তা কেন্দ্রীক করে শহীদ পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেওয়ায় এই পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সহায়তা নিয়ে পরিবারে নানা দ্বন্দ্ব, হয়রানি ও বিলম্ব দেখা দিচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিধিমালা, ২০২৫’ তৈরি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পূর্বে অনুদান দেওয়ার সময় ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন মেনে শহীদ পরিবারকে অর্থ দেওয়া হলেও অনেকেই তা মানতে চাননি। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন সরকার ধর্মীয় আইন অনুসরণ করে অনুদান ভাগ করছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন বিধিমালা দিয়ে সহায়তার বণ্টন পদ্ধতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে। সরকারিভাবে শহীদ পরিবারকে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১০ লাখ এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাকি ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান হবে। এছাড়া শহীদ পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতাও দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৮৪৪ জন শহীদের গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, পরে আট জনের গেজেট বাতিল করা হয়।
৭ আগস্ট উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকারি সহায়তা নিয়ে শহীদ পরিবারের দ্বন্দ্ব আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা শফিকুল আলম বলেন, ‘শহীদ পরিবারের মধ্যে কে অর্থ পাবেন তা নিয়ে দ্বন্দ্ব হচ্ছে। এজন্য নতুন বিধি করা হবে, যেখানে প্রত্যেকের অংশ নির্ধারিত থাকবে। এক সপ্তাহের মধ্যে সবাই জানতে পারবেন।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মশিউর রহমান জানান, ‘শহীদ পরিবারের অর্থ কীভাবে বণ্টন হবে তা বিধিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বড় অংশও বিধিমালা অনুযায়ী বিতরণ করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নতুন বিধিমালা প্রয়োগের মাধ্যমে শহীদ ও যোদ্ধাদের সহায়তা ও পুনর্বাসনে আমরা একটি গাইডলাইন পেলাম।’
অর্থ বণ্টনের নিয়ম:
- শহীদদের স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং বাবা-মায়ের মধ্যে আর্থিক সহায়তা সমান তিন ভাগে ভাগ হবে।
- একাধিক স্ত্রী বা সন্তান থাকলে তাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।
- বাবা-মায়ের মধ্যে সমান ভাগ, কোনো একজন না থাকলে অপরজন পুরো অংশ পাবেন।
- স্বামী বা স্ত্রী না থাকলে তাদের অংশ সন্তান ও বাবা-মায়ের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।
- সন্তান না থাকলে সন্তানদের অংশ স্বামী বা স্ত্রী এবং বাবা-মায়ের মধ্যে ভাগ হবে।
- বাবা-মা না থাকলে তাদের অংশ স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে ভাগ হবে।
- অবিবাহিত শহীদের অনুদান বাবা-মায়ের মধ্যে ভাগ হবে, একজন না থাকলে অপরজন পুরো অংশ পাবেন।
ভাতা সম্পর্কিত নিয়ম:
- মাসিক ভাতা প্রাপ্ত সদস্য মারা গেলে ভাতা তারিখ থেকে বন্ধ হবে।
- স্বামী বা স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করলে তার মাসিক অংশ বন্ধ হবে।
- জুলাই যোদ্ধা মারা গেলে এককালীন ও মাসিক ভাতার অংশ বন্ধ হবে।
চিকিৎসা ও শহীদ স্বীকৃতি:
- হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হলে জুলাই যোদ্ধাকে শহীদ ধরা হবে।
- পরিবারের সদস্যরা এককালীন ৩০ লাখ টাকার সমমূল্যের সঞ্চয়পত্র পাবেন।
- মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতাও পাবেন।
- সরকারি হাসপাতাল ও নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে।
- হেলথ কার্ড দেখিয়ে চিকিৎসা সেবা নেওয়া যাবে, লিখিত আবেদন প্রয়োজন নেই।
কল্যাণ ও পুনর্বাসন:
- কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা তিনটি কমিটি শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনের কাজ দেখবে।
- কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মন্ত্রী বা উপদেষ্টা, জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক, উপজেলা কমিটির সভাপতি ইউএনও হবেন।
- পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিধি অনুযায়ী হবে।
- প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে বিভিন্ন প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে।
- আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ঋণ বা সুবিধা দেওয়া যাবে।
বিরোধ নিষ্পত্তি:
- শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অর্থ বা পুনর্বাসন নিয়ে বিরোধ হলে সালিশ বোর্ড গঠন করা হবে।
- বোর্ডে শহীদ পরিবারের একজন সদস্য, অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ও দুই পক্ষের মনোনীত একজন সালিশকারী থাকবেন।
- সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে ৩০ দিনের মধ্যে মহাপরিচালকের কাছে আপিল করা যাবে। তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

