মিথ্যা তথ্য দিয়ে পণ্য বিক্রি করলে অনলাইন বিক্রেতাকে দেওয়া হবে দুই বছরের কারাদণ্ড। অনাদায়ে জরিমানার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা। উভয় দণ্ড একসঙ্গে আরোপও সম্ভব। নির্ধারিত সময়ে পণ্য বা সেবা সরবরাহ না করলে মূল্যের কয়েক গুণ জরিমানা বসানো হবে। নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের জরিমানা ধার্য থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকার এই সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে ‘ডিজিটাল বাণিজ্য’ অধ্যাদেশ জারি করতে যাচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা করে জানিয়েছেন, দেশের হাজার হাজার গ্রাহক ডিজিটাল কোম্পানি বা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়ে পণ্য পাননি। ২০২১-২২ সালে অনেকে টাকা ফেরতের দাবিতে মিছিল, সমাবেশ ও রাস্তা অবরোধ করেছেন। এসব ঘটনা বিবেচনায় রেখে নতুন অধ্যাদেশ তৈরি করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের মে মাসেও তৎকালীন মন্ত্রিসভা অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন করেছিল কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিষয়টি এগোয়নি। এখন খসড়াটি নতুন করে তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খসড়া অধ্যাদেশটি বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের কাছে পাঠিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন হবে। পাস হলে এটি ‘আইনের খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক মতামত প্রদান সংক্রান্ত কমিটি’-র বৈঠকে যাবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, বিষয়টি তাঁর নজরে আসেনি। এখন তিনি খোঁজ নেবেন। খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘ডিজিটাল বাণিজ্য’ বলতে যেকোনো ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনে পণ্য ও সেবা কেনাবেচাকে বোঝানো হবে। পণ্য বা সেবা অনলাইনে প্রদর্শিত বা ঘোষিত হতে হবে এবং মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
‘ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান’ বলতে বোঝানো হবে, অনলাইনে নিজস্ব নামে বা পরিচালনায় ওয়েবসাইট, মার্কেটপ্লেস বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে এককভাবে বা যৌথভাবে পণ্য বা সেবা বিক্রি করবে বা প্রদর্শন/ঘোষণা দেবে—এ ধরনের নিবন্ধিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ই-কমার্স খাতের বিকাশ ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এ অধ্যাদেশ গঠন করা হচ্ছে। পাস হলে একটি বিশেষ কর্তৃপক্ষ গঠন হবে। এটি ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসার, শৃঙ্খলা রক্ষা, বাণিজ্য-বিরোধ নিষ্পত্তি ও অপরাধ প্রতিরোধের তদারকি করবে।
কর্তৃপক্ষ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও আমদানিনিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি হচ্ছে কিনা, ওষুধপণ্যের মোড়কে সঠিক ব্যবহারবিধি, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ ছাড়া অনলাইন বিক্রি হচ্ছে কিনা, অসত্য বা অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহক প্রতারণা হচ্ছে কিনা—এসব বিষয় তদারক করবে। খসড়ায় বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া ডিজিটাল বা গিফট কার্ড, ওয়ালেট, ক্যাশ ভাউচার করা যাবে না। লটারির আয়োজন করলেও বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে।
লাইসেন্স ছাড়া কোনো ই-কমার্স বা ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যাবে না। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) দেওয়া হবে। তবে প্রতারণামূলক কার্যক্রম করলে কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে বিদেশি সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে অনুদান, প্রকল্প বা ঋণসহায়তা নেওয়া যাবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল বাণিজ্যে দেশি উদ্যোক্তাদের বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি বৃদ্ধি, অনলাইন কার্যক্রম পরিদর্শন, অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে। তবে অনলাইন ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং, অনলাইন জুয়া, লটারি, যৌন উত্তেজক সামগ্রী এবং অনলাইন এসকর্ট সেবা এই আইনের আওতার বাইরে থাকবে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ই-কমার্স শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। পূর্ণাঙ্গ ও পেশাদার ই-কমার্সের যাত্রা শুরু ২০০৯ সালে। খাতের বিকাশ ঘটে ২০১৪ সালে।
২০১৮ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা প্রণয়ন করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিমালাটি অসম্পূর্ণ ছিল। বিদেশি বিনিয়োগ বিষয়টি ছিল না। ২০২০ সালের জুনে নীতিমালা সংশোধন করে বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করা হয়। অধ্যাদেশ পাস হলে ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হবে। এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। নির্বাহী চেয়ারম্যান ও চার সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। উপদেষ্টা পরিষদে বাণিজ্যমন্ত্রী, বাণিজ্য উপদেষ্টা বা প্রতিমন্ত্রীকে প্রধান করা হবে।
ডিজিটাল বাণিজ্যবিষয়ক গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুবর্ণ বড়ুয়া বলেন, দেশে অনলাইনে অনেক ঘটনা ঘটেছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ না থাকায় মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। আইন ও কর্তৃপক্ষ থাকলে অনলাইন কেনাবেচার সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে।

