গণতন্ত্রের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো আইনের শাসন। কোনো দেশে আইনের শাসন না থাকলে সত্যিকারের গণতন্ত্র কার্যকর হয় না। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে এই শাসন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। প্রভাবশালী মহল আইনকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে, কখনও প্রকাশ্য, কখনও গোপনে।
রায় প্রদানের সময় ক্ষমতাবানদের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠে। এমনকি সরাসরি হস্তক্ষেপও ঘটে। আদালত জনগণের শেষ ভরসা হলেও, সেখানে বিচারপ্রার্থীরা প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হন। আদালতের প্রাঙ্গণে নিরাপত্তাহীনতার দৃশ্যও কম দেখা যায় না। কোর্টে হাজিরা দিতে গিয়ে অনেকেই অপমান ও লাঞ্ছনার সম্মুখীন হন। আইন ও আদালতের এই দুর্বলতা গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষ যখন সুরক্ষা ও ন্যায়ের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হন, তখনও তারা প্রায়শই নিরাপত্তাহীনতা ও অনিরাপদ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এ চিত্র দেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সাবেক ঊর্ধ্বতন আমলা হইতে শুরু করিয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অনেক নাগরিক যখন কোর্ট আঙিনায় হেনস্তার শিকার হন, তখন এই সকল দেশে ন্যায়বিচার কীভাবে পাওয়া যাইতে পারে? কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যখন আদালতে আনা-নেওয়া করা হয় এবং সেখানে হাজির করিবার প্রয়োজন পড়ে, তখন তাহার সার্বিক নিরাপত্তার প্রতি নজর দেওয়া কি কাম্য নহে? যেইহেতু তিনি বিচারাধীন ব্যক্তি, সেইহেতু তাহাকে কেহ কটূক্তি করিবে কেন? সেই পরিবেশই-বা কেন থাকিবে?
কিন্তু উন্নয়নশীল অনেক দেশে দেখা যায়, কোর্ট প্রাঙ্গণে, সিঁড়িতে, এমনকি খোদ আদালতে বিচারকের সম্মুখে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপমানিত-অপদস্ত করা হয়। ইহার চাইতেও মারাত্মক প্রবণতা হইল, বিচারকের সম্মুখে শারীরিকভাবে হামলাও করা হয়। বিচারক ও পুলিশের উপস্থিতিতে কে বা কাহারা এমন আচরণ করেন, তাহা পরবর্তী সময়ে তদন্ত করিয়া ব্যবস্থা গ্রহণ করা কি বাঞ্ছনীয় নহে? কোনো আইনজীবীও যদি এমন অবিবেচক ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেন, তাহার জন্য কি আইন তাহার নিজস্ব গতিতে চলিবে না?
বস্তুত বিশৃঙ্খলা করা সহজ; কিন্তু মনে রাখা দরকার ইহা অনেক সময় একতরফা হয় না। তৃতীয় বিশ্বের এই সকল দেশের আদালত প্রাঙ্গণে এইভাবে বিশৃঙ্খলা চলিতে থাকিলে এই সকল দেশ যে বসবাসের অযোগ্য হইয়া যাইবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। নৈরাজ্য ও সংঘাত-সংঘর্ষই তখন অনিবার্য হইয়া দাঁড়াইবে। আইনের চোখে সকলেই সমান; কিন্তু এই সকল দেশে আসলেই কি আইন সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখে বা দেখিতে পারে? বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিরোধী দলে ছিলেন, তখন গত বৎসরের শুরুর দিকে তাহার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার জন্য তাহাকে কোর্টে হাজির করা হয়। সেই সময় তাহাকে একাধিকবার বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হইতে হয়। যখন আদালতকক্ষে তাহার বিচার চলিতেছিল, তখন অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে কক্ষের তাপমাত্রা এক বা দুই ডিগ্রি বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হইলে তাহার প্রতি করা হয় ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ।
কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহেন, হউক তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রি-এমপি বা একজন দারোয়ান; কিন্তু কোর্টে আসামিকে লক্ষ করিয়া হাতাহাতি করা, গালিগালাজ করা, আক্রমণাত্মক অঙ্গভঙ্গি করা, এমনকি ভ্রুকুটি দেখানো বা বিড়বিড় করা অন্যায় ও অনৈতিক। আমেরিকার মতো উন্নত দেশ বলিয়াই সেইখানে বিচারক আসামির প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের কারণে তিরস্কার বা জরিমানার ব্যবস্থা করেন; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে ইহা সাধারণ ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে যাহা খুবই দুঃখজনক।
প্রকৃতপক্ষে উন্নত-অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বলিয়া কথা নহে, সকল দেশের সকল আদালতে আসামির প্রতি সদয় ও যৌক্তিক আচরণ করা প্রয়োজন। তাহাদের কোর্টে হাজির করিবার সময় এমন আচরণ করা যাইবে না যাহাতে তাহার বা তাহাদের আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য মনোবেদনার কারণ হয়। তাহারা কোনো অন্যায়-অনিয়ম বা অপরাধ করিলে আইন অনুযায়ী তাহাদের অবশ্যই শাস্তি হইবে: কিন্তু বিচারের আগে বিচার করা কিংবা তাহাদের মানসম্মানে আঘাত করা কিছুতেই কাম্য হইতে পারে না। ন্যায়বিচারের স্বার্থেই ইহার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা প্রয়োজন। এমনকি কোর্টের বাহিরেও তাহাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াইয়া দেওয়া বা শারীরিক-মানসিকভাবে নাজেহাল করিবার প্রবণতাও বন্ধ হওয়া জরুরি। সূত্র: ইত্তেফাক

