ঢাকা বা আশপাশের শহরগুলো নয়, দেশব্যাপী পরিবহন খাতের নানা পরিষেবা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিইউটিএ) প্রতিষ্ঠার খসড়া আইন ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর উত্থাপিত হয়েছিল। তখন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) নিজেদের আইনের কিছু ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিটিসিএ বিলুপ্ত করে বিইউটিএ গঠন করে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় ও গুরুত্বপূর্ণ শহরের পরিবহন ব্যবস্থাকে সমন্বয় করা হবে।
এই পরিকল্পনা এখন ফাইলবন্দি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আইন অনুবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা খসড়া আইনের ব্যাপারে জানেন না। যারা খসড়া আইন উত্থাপন করেছিলেন, সেই ডিটিসিএ কর্মকর্তারাও এখন আর আইনটি নিয়ে এগোতে আগ্রহী নয়। ২০১২ সালে গঠিত হয় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএ। এর কার্যক্ষেত্র ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ। প্রতিষ্ঠার দুই বছর পরই ডিটিসিএ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২১ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) মাধ্যমে বিইউটিএর খসড়া আইন তৈরি করা হয়। ডিটিসিএ তখন আইনের বিভিন্ন ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, ডিটিসিএ বিলুপ্ত হয়ে বিইউটিএ প্রতিষ্ঠিত হলে সংস্থার কার্যক্রম বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নেতৃত্ব ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব এসেছে। বিদ্যমান ডিটিসিএ আইনে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে শাস্তি বা জরিমানা করার বিধান নেই। বিইউটিএ আইনে জরিমানা ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেল, বিআরটি, সার্কুলার বাস রুট, কমিউটার রেল ব্যবস্থার লাইসেন্সিং ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ধারা স্পষ্ট করা হয়েছে। বিইউটিএ প্রতিষ্ঠা হলে মেট্রোরেল, বিআরটি, সার্কুলার ও কমিউটার রেলসহ সব পরিষেবা এক সংস্থার অধীনে পরিচালিত হবে। এই সংস্থা লাইসেন্স ইস্যু, ভাড়া নির্ধারণ, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতি পরিচালনা এবং বিভিন্ন পরিবহন পরিষেবার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।
বর্তমানে ডিটিসিএ যাত্রীদের স্মার্ট কার্ড (র্যাপিড পাস) দিয়ে মেট্রোরেল, বিআরটি ও বিআরটিসির এসি বাস পরিষেবা চালাচ্ছে। বিইউটিএ প্রতিষ্ঠা হলে এই পরিষেবা বিস্তৃত হবে, সাথে সার্কুলার বাস ও কমিউটার রেলের ভাড়া আদায় ও ব্যবস্থাপনা সংস্থার অধীনে থাকবে। খসড়ায় ক্লিয়ারিং হাউজের মাধ্যমে সব র্যাপিড পাস পরিষেবা সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করার প্রস্তাব আছে। নগর এলাকায় ট্রাফিক ও পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়নের জন্য নীতিমালা ও প্রবিধান প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে একক কর্তৃত্বও বিইউটিএকে দেওয়া হবে। নগর এলাকায় কোনো ব্যক্তি পরিবহন প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রাথমিক সম্মতি এবং বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন ছাড়পত্র নিতে হবে সংস্থা থেকে। খসড়ায় নগর পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পরামর্শক পুল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে।
বিইউটিএ আইনের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আইন অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আইন নিয়ে বিস্তারিত জানি না। খসড়া কখন হয়েছিল তা মনে নেই।” ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আখতার বলেন, “আইন নিয়ে এখন আলোচনা কম। পরিকল্পনা কমিশনে ডিটিসিএর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়েছিল। আইনের খসড়া এখন পর্যালোচনায় আছে। অনেক বিশ্লেষণ বাকি। কারণ স্টেকহোল্ডার অনেক। সবার মতামত নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “বিদ্যমান ডিটিসিএ আইন কার্যকর করতে হবে। নতুবা নতুন সংস্থা তৈরি হলে হাজারো প্রশ্ন উঠবে।”
বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, “নগরে পরিবহন সমন্বয়ে ডিটিসিএ কি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে? তার সক্ষমতা কোথায়? রাজউক, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বিআরটিএ বা বিআরটিসির কর্মকর্তারা কেন তাদের কথা শুনবে? নতুন সংস্থা বা অর্গানোগ্রাম তৈরি হলেও লাভ কম। আগে ডিটিসিএকে সক্রিয় করে সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে কাজ করতে হবে।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “বিভিন্ন শহরে যানবাহন পরিচালনার জন্য একক সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান দরকার। যানবাহন নীতিমালা ও সড়ক অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় নেই। রাজধানীতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ডিটিসিএ ব্যর্থ। বিইউটিএ গঠনের আগে সংস্থাটিকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিতে হবে। না হলে এটি কিছু ব্যক্তির পদায়ন ও আরেকটি ছোট প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে।”

