বাংলাদেশের বিচার বিভাগে আলোচিত ১২ জন বিচারপতির তালিকায় এখনও চারজন রয়েছেন যাদের ভাগ্য নির্ধারণ হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ সংবিধানসম্মত প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তিতে সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অস্থির সময় শুরু হয়। সেই সময়ে হাইকোর্ট চত্বরে শিক্ষার্থী ও আইনজীবীদের বিক্ষোভে বিচারকদের পদত্যাগের দাবিও উঠে আসে। অভিযোগ ছিল—তারা ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের দোসর হয়ে কাজ করেছেন, দুর্নীতি ও দলবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
১৬ অক্টোবরের সেই বিক্ষোভ ছিল টার্নিং পয়েন্ট। শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে হাইকোর্টের সামনে জড়ো হয়, স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। পরে রেজিস্ট্রার জেনারেল এসে ঘোষণা দেন, অভিযুক্ত বিচারকদের বেঞ্চ থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালতের কাজ তারা করতে পারবেন না।
এরপর থেকে শুরু হয় পদত্যাগ, অপসারণ ও অবসরের ধারাবাহিকতা।
-
বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
-
বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসাইন দোলন স্থায়ী নিয়োগ পাননি, ফলে তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
-
বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস অবসরে যান।
-
বিচারপতি খিজির হায়াত ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানকে রাষ্ট্রপতি সরাসরি অপসারণ করেন।
-
সর্বশেষ বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করেন।
এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে শূন্য হয়ে গেছে বিতর্কিত বিচারকদের তালিকা, তবে এখনও চারজন বিচারপতির বিরুদ্ধে কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পর এই কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই কাউন্সিল গঠিত হয়—অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তাদের দায়িত্ব হলো কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি যাচাই-বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো।
এখন যে চারজন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, তাদের নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, অভিযোগগুলো গুরুতর এবং শিগগিরই কাউন্সিলের তদন্ত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে এত সংখ্যক অভিযোগ ও পদক্ষেপ নজিরবিহীন। অনেক আইনজীবী মনে করছেন, এটি বিচার বিভাগের জন্য নতুন এক অধ্যায়, যেখানে দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, এই প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় পরিণত না হয়, সেটিই বড় চ্যালেঞ্জ।

