ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন হাইকোর্টে সম্প্রতি নতুন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হলেও তালিকায় নারীর উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ স্তরে নারী প্রতিনিধিত্বের সংকট নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এন ভি রামনার পাশে চার নারী বিচারপতির ছবি ভাইরাল হয়েছিল। ৩৪ সদস্যের বেঞ্চে সেটিই ছিল সর্বোচ্চ নারী প্রতিনিধিত্ব। তখন একে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলা হয়েছিল। অনেকের প্রত্যাশা ছিল, ভারতের শীর্ষ আদালতে লিঙ্গ বৈষম্যের দীর্ঘ ইতিহাস ভাঙতে শুরু করবে কিন্তু চার বছর পর সেই আশা প্রায় মিলিয়ে গেছে। বর্তমানে কেবল বিচারপতি বি ভি নাগরথ্না দায়িত্বে আছেন। বাকিরা অবসরে গেছেন এবং নতুন করে কোনো নারী বিচারপতি নিয়োগ পাননি।
অ্যাডভোকেট স্নেহা কলিতা বলেন, “এটি ভয়ংকর এবং এক কথায় বিপর্যয়কর। সুপ্রিম কোর্ট আবারও পুরুষদের ক্লাব হয়ে দাঁড়িয়েছে।” নারী আইনজীবীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনি ইতিমধ্যে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আদালতে আবেদন করেছেন। ভারতের বিচারব্যবস্থা শুরুর দিন থেকেই পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৫০ সালে সুপ্রিম কোর্ট গঠনের পর প্রথম নারী বিচারপতি নিয়োগে লেগেছিল ৩৯ বছর। ১৯৮৯ সালে ফাতেমা বিবি ইতিহাস গড়েন। ৭৫ বছরে সুপ্রিম কোর্টে এখন পর্যন্ত বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮৭। এর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১১ জন, যা মোটের মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
হাইকোর্টগুলোতেও একই চিত্র। বর্তমানে ৬৭০ জন পুরুষ বিচারপতির বিপরীতে নারী বিচারপতি আছেন মাত্র ১০৩ জন। অন্তত চারটি হাইকোর্টে একজন নারী বিচারপতিও নেই। সাম্প্রতিক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে কারণ সুপ্রিম কোর্টের দুটি শূন্য পদে কোনো নারীকে মনোনীত করা হয়নি। অথচ কয়েকটি হাইকোর্টে সিনিয়র নারী বিচারপতির নাম ছিল তালিকায়।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন (এসসিবিএ) বিষয়টি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে। সংগঠনের সভাপতি ভিকাশ সিং বলেন, “নিম্ন আদালতগুলোতে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নারী বিচারপতি রয়েছেন, কারণ সেখানে নিয়োগ হয় পরীক্ষার মাধ্যমে। কিন্তু উচ্চ আদালতে যেখানে কোলেজিয়ামের মাধ্যমে বিচারপতি নির্বাচিত হন, সেখানে নারী বিচারপতি ১০ শতাংশেরও কম। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
অ্যাডভোকেট জয়না কোঠারি বলেন, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশে বিচারব্যবস্থায়ও বৈচিত্র্য থাকা জরুরি। তাঁর ভাষায়, “আঞ্চলিক বৈচিত্র্য যেমন গুরুত্ব পায়, তেমনি লিঙ্গ বৈচিত্র্যও পাওয়া উচিত। নারীরা দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক, কিন্তু বিচার বিভাগে তাঁদের উপস্থিতি প্রায় শূন্যের কোঠায়।” তিনি আরও মনে করেন, নারী বিচারপতিরা ভিন্ন জীবন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন, যা সঠিক রায় দিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, আদালতে নারী বিচারপতির উপস্থিতি অনেক সময় নারীবিদ্বেষী মন্তব্য ঠেকাতে ভূমিকা রাখে।
সমাধান হিসেবে অনেকে নারী কোটা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন এতে যোগ্যতার মান ক্ষুণ্ন হতে পারে। তবে স্নেহা কলিতা তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে, নারী আইনজীবীরা পুরুষ সহকর্মীদের চেয়ে বেশি পরিশ্রমী, পরিবার ও পেশা একসঙ্গে সামলাতে হয় বলে তাঁদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যায্য।
আইনজীবী মহলের অনেকে প্রস্তাব করেছেন, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ৩০ শতাংশ নারী বিচারপতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। তাঁদের বিশ্বাস, উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে নারীর উপস্থিতি বাড়লে আরও বেশি নারী আইনজীবী এই পেশায় টিকে থাকার অনুপ্রেরণা পাবেন। অন্যথায় অনেকে ভাববেন এত পরিশ্রমের পরও শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

