যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ হ্রাস বিষয়ে সরকারি ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। গত রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলিয়াছেন, বয়স বিবেচনায় নারীদের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ হইতে পারে ২০ বৎসর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে উহা সামান্য বৃদ্ধি পাইবে।
বর্তমানে ১৮৬০ সালের পেনাল কোড অনুযায়ী, বাংলাদেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ ৩০ বৎসর। এমন সিদ্ধান্ত গৃহীত হইলে অন্তত দুই সহস্র বন্দি এখনই মুক্তি পাইতে পারেন। কারণ যাবজ্জীবন সাজার অংশরূপে তাহারা ২০ বৎসরের অধিক সময় কারান্তরীণ। অবশ্য এই কারাবন্দিদের সরকার ইচ্ছা করিলে অন্যভাবেও মুক্তি দিতে পারে। কারাবিধির ৫৬৯ ধারা অনুসারে, কোনো বন্দি সাজার মেয়াদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোগ করিবার পর তাঁহাকে মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করা যায়, যদি তাঁহার বিরুদ্ধে অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ না থাকে। এই ধরনের পদক্ষেপের জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনেরও প্রয়োজন হয় না।
বিগত সরকারগুলি তো বটেই, এই সরকারও গত জুলাই মাসে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং অন্তত ২০ বৎসর কারাগারে ছিলেন, এমন ২৯ বন্দিকে মুক্তি দিয়াছে। সরকারের এহেন পদক্ষেপকে স্বাগত জানাইবার কারণ হইল, ইহাতে কারাগারে বন্দির সংখ্যা ও চাপ হ্রাস করা যায়। তৎসহিত বন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণও নিশ্চিত করা যায়। আমরা জানি, যেই কোনো গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রে কারাগারকে নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে সংশোধনাগাররূপে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির সহিত উপযুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে অনেক গুরুতর অপরাধীর মধ্যেও আইনকানুন সম্পর্কে ইতিবাচক উপলব্ধি গড়িয়া তোলা যায়। ২০ বৎসরের অধিক দণ্ড ভোগকারীদের প্রতি সরকারের এহেন ইতিবাচক ভাবনার প্রসঙ্গ ধরিয়া আরেকটি কথাও এইখানে বলা যায়, আমরা মনে করি। দীর্ঘ সময় যাবৎ হাজতে আছেন অথচ বিচার প্রক্রিয়া অদ্যাবধি সমাপ্ত হয় নাই, এমন বন্দিদের জামিনের বিষয়ও বিবেচনা করা যায়।
কারাসূত্র অনুসারে, বর্তমান বন্দিদের মধ্যে ৫৯ সহস্র হাজতি, যাহাদের মধ্যে অনেকের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরিয়া অনিষ্পন্ন। সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে অপরাধের গুরুত্ব, আসামির বয়স, আসামির শারীরিক অবস্থা, লিঙ্গ পরিচয়, সাক্ষীর প্রতি প্রভাব না খাটানো, মামলার গুরুত্ব ও আসামির সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় লইয়া আদালত জামিন প্রদান করিতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ, বিশেষত জামিনের প্রতি বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তব্যক্তিদের নেতিবাচক মনোভাব, তৎসহিত বিভিন্ন জেলার আদালতে প্রভাবশালী বিভিন্ন দলভুক্ত আইনজীবীদের ‘মব সন্ত্রাস’ চলমান থাকায় বায়বীয় মামলার উল্লেখযোগ্যংখ্যক আসামিও জামিন হইতে বঞ্চিত হইতেছেন।
শুধু উহাই নহে, গত রবিবারের সভায় সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কম সময়ের মধ্যে কীভাবে জামিন পাইতেছেন, তাহা লইয়া কার্যত উষ্মা প্রকাশ করা হয় বলিয়া পত্রিকান্তরে প্রকাশ। এমনকি উক্ত জামিনের ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কিনা, তাহা খতাইয়া দেখিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে চার সদস্যের কমিটিও গঠিত হইয়াছে। বিষয়টি একদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উপর নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপতুল্য, অন্যদিকে আইনের শাসনেরও ব্যত্যয়। সরকারের এহেন প্রবণতা এমন সময়ে প্রকাশিত হইতেছে, যখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সর্বাপেক্ষা জরুরি বিবেচিত হইতেছে।
আমরা মনে করি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও অন্যায়ভাবে আটকের অতীত সরকারগুলির নীতি অবসানের প্রতিশ্রুতি হইতে অন্তর্বর্তী সরকারের সরিয়া যাইবার অবকাশ নাই। সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষা বিষয়ে সরকারের শীর্ষ মহলের প্রতিশ্রুতিরও বাস্তবায়ন কাম্য। ফলে শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রতি উদারতা দেখাইলে চলিবে না; নাগরিকের জামিন ও ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির অধিকারও নিশ্চিত করিতে হইবে। সূত্র: সমকাল

