সংবিধান ও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ‘দ্য অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩’ সংশোধন ও হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে শতবর্ষ পুরোনো এই আইনকে যুগোপযোগী করার কাজ শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজিতে প্রণীত আইনটির বাংলায় নতুন রূপও দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ বজায় রাখতে এ আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। তার ভাষ্য, আইনটি নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ৩ ও ৫ ধারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। মানবাধিকার কর্মীরাও বারবার এই দুর্বলতা তুলে ধরেছেন। অথচ অতীতের কোনো সরকারই আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়নি। ফলে সাংবাদিকদের ওপর এর অপব্যবহারই হয়েছে বেশি।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি শীর্ষ দৈনিকের নারী সাংবাদিককে এই আইনের ৩ ও ৫ ধারায় মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ করেছেন এবং ‘রাষ্ট্রীয় গোপন নথি নিজের দখলে রেখেছেন’। জননিরাপত্তা বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও জানান, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ধারায় অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। আর ৫ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড অথবা ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে বিচারক চাইলে সর্বনিম্ন তিন বছরের সাজা দিতে পারেন।
তিনি আরো যোগ করেন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের বিতর্কিত ৩ ও ৫ ধারায় বড় ধরনের সংশোধন আনা হবে। এমনকি ধারা দুটি বাতিলও হতে পারে। কারণ মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো এ দুটি ধারার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
আইনটি সংশোধন ও হালনাগাদ করতে ইতিমধ্যেই জননিরাপত্তা বিভাগ একজন আইন ও বিধি পরামর্শক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। প্রাপ্ত আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে সুপারিশ ও নিয়োগ চূড়ান্ত করতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে আছেন জননিরাপত্তা বিভাগের আইন ও শৃঙ্খলা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব। সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে যুগ্ম সচিব (আইন), উপসচিব (প্রশাসন-২) এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে। আর সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন জননিরাপত্তা বিভাগের সহকারী সচিব (আইন-২)।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন মনে করে, সরকারি তথ্য উন্মুক্ত হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, দুর্নীতি কমবে। এজন্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩ ও সাক্ষ্য আইন-১৮৭২ সংশোধন করে যুগোপযোগী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ, সত্যান্বেষী ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
১৯২৩ সালের ২ এপ্রিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়। পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৩০ জুন ‘দ্য বাংলাদেশ ল’জ (রিভিশন অ্যান্ড ডিক্লারেশন) অ্যাক্টের দ্বিতীয় তপশিলে সামান্য পরিবর্তন এনে আইনটি বাংলাদেশের অংশ করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হওয়ার পর ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া শত বছরের পুরোনো অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে। কারণ নতুন আইন সবসময় পুরোনো আইনের ওপর অগ্রাধিকার পায়। তবুও রাষ্ট্রযন্ত্র এখনও আইনটির অপব্যবহার করছে। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাংবাদিকরা।
তাদের মতে, ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকাতে এ আইন করেছিল কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাই অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারা সরাসরি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তথ্যপ্রবাহ ও মানুষের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে এ আইনে বড় পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকরা।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘ব্রিটিশরা যখন এই উপমহাদেশ শাসন করছিল, তখন তারা বিশ্বব্যাপী নানা যুদ্ধে জড়িত ছিল। উপনিবেশ টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা জরুরি ছিল বলেই আইনটি প্রণয়ন করে। তখন সেটি দরকারও ছিল কিন্তু স্বাধীনতার পর আমাদের সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্য অধিকার আইনে জনগণের তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে এখনও তথ্য গোপন রাখার সংস্কৃতি চালু আছে। যা সংবিধান ও তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।’
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আর বলেছেন, প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে এই আইনেই গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ফলে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে এক ধরনের কাঁটায় পরিণত হয়েছে। তার মতে, বর্তমান বিশ্বে সাংবাদিকতার ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশেও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ আমলের এই আইন দ্রুত সংশোধন করা জরুরি। তবে সংশোধনের নামে যেন পুরোনো বিতর্কিত ধারাগুলো নতুনভাবে আইনটিতে ঢুকে না পড়ে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো গোপন রাখার বিধান রেখে অন্য ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এই আইনজীবী।
বিতর্কিত ও সমালোচিত এই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করা, সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করা, কোনো নকশা বা স্কেচ তৈরি করা কিংবা গোপন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ৩ (ক) ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নিষিদ্ধ স্থানের কোনো ছবি, নকশা বা স্কেচ প্রকাশ করা যাবে না। আরও কঠোর শাস্তির বিধান আছে ৩ (১) ধারায়। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কেউ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা স্বার্থবিরোধী উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ এলাকায় যায়, শত্রুপক্ষের উপকারে আসতে পারে এমন কোনো নকশা, পরিকল্পনা, মডেল বা নোট তৈরি করে, কিংবা কোনো অফিসিয়াল গোপন কোড, পাসওয়ার্ড, নথি বা তথ্য সংগ্রহ, রেকর্ড, প্রকাশ বা পাচার করে, তবে সে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে।
অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থিমূলক কোনো কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই ধারার ৩(৩)(ক) অংশে উল্লেখ আছে, যদি অপরাধটি বিদেশি শক্তির স্বার্থে বা প্রয়োজনে সংঘটিত হয়, তবে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড। অন্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ এলাকা বা সরকার ঘোষিত এলাকার গোপনীয় অফিসিয়াল কোড, পাসওয়ার্ড, নকশা, পরিকল্পনা, মডেল, নোট, দলিল বা তথ্য নিজের দখলে রেখে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন না করে এবং তা অন্যের কাছে হস্তান্তর করে কিংবা অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্র ব্যবহার করে, তবে তাকেও অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে। একই ধারার ৫(ক) উপধারায় প্রতিরক্ষা নির্মাণকাজ, অস্ত্রাগার, সেনা, নৌ বা বিমানবাহিনীর স্থাপনা, খনি, মাইনক্ষেত্র, কারখানা, ডকইয়ার্ড, ক্যাম্প বা বিমানসংক্রান্ত গোপন তথ্য ফাঁস করলে মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, সরকারি তথ্য গোপন রাখার পরিবর্তে নাগরিকদের অবাধ তথ্যপ্রাপ্তির সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টকে বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন করতে হবে। ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে মিল রেখে আইনটি সংস্কার করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সরকারি গোপনীয় তথ্যের সংজ্ঞায়ন যেন অযৌক্তিকভাবে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সীমিত না করে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে আইনের ৩ ও ৫ ধারায় যে বাধা রয়েছে, তা দূর করা প্রয়োজন। এতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা নির্ভয়ে জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন।

