কলকাতা হাইকোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বলা হয়েছে, স্বামী কর্মক্ষম হলে তিনি বেকারত্ব বা আর্থিক সংকটের অজুহাতে স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দিয়ে দায় এড়াতে পারবেন না। আদালত স্পষ্ট করেছেন, স্ত্রীকে মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ দিতে হবে। তাঁকে অনাহারে বা অর্ধাহারে ফেলে রাখা যাবে না।
রিঙ্কি চক্রবর্তী নামে এক নারী ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় ভরণপোষণের আবেদন করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, তাঁকে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং স্ত্রীধন থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় ফ্যামিলি কোর্ট তাঁকে মাসিক ৪ হাজার টাকা অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণ মঞ্জুর করে। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টও তা বহাল রাখে।
তবে মামলার মূল শুনানিতে স্বামী দাবি করেন, স্ত্রী চাকরিজীবী এবং বেতন পান, অন্যদিকে তিনি চাকরি হারিয়ে বেকার। সেই যুক্তি মেনে ফ্যামিলি কোর্ট আবেদন খারিজ করে দেয়। এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টে আসেন স্ত্রী। শুনানিতে বিচারপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, স্ত্রী যদি ভরণপোষণের যোগ্য হন তবে তা অবশ্যই দিতে হবে, যাতে তিনি সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন। স্বামী কর্মক্ষম থাকলে নিজের কর্মহীনতার অজুহাতে দায় এড়াতে পারবেন না।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে বলেন, ভরণপোষণ মামলা কেবল আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও অংশ। সংবিধানের ১৫(৩) ও ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্ত্রীকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করাই ভরণপোষণের লক্ষ্য। বিচারপতি আরও উল্লেখ করেন, স্ত্রী মাসে ১২ হাজার টাকা আয় করলেও তা স্বামীর তুলনায় আর্থসামাজিক অবস্থানে সমান সুযোগ দেয় না। স্বামী নিজেই স্বীকার করেছেন তাঁর পারিবারিক অবস্থা স্ত্রীর চেয়ে উন্নত। তাই স্ত্রীর উপার্জনকে ভরণপোষণ প্রত্যাখ্যানের ভিত্তি হিসেবে ধরা যায় না।
রায়ে আরও বলা হয়, স্বামী নিজের দোষে চাকরি হারালেও ইচ্ছাকৃতভাবে বেকার থাকতে পারেন না। কর্মক্ষম হয়েও কাজ না করলে সেটি দায় এড়ানোর অজুহাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ফ্যামিলি কোর্টের রায় আইনসঙ্গত নয় এবং তা বহাল রাখা যায় না।
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট ফ্যামিলি কোর্টের আদেশ বাতিল করে স্বামীকে মাসিক ৪ হাজার টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। আবেদন দায়েরের তারিখ থেকেই এ নির্দেশ কার্যকর হবে। বকেয়া টাকা ১২ কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে, নইলে স্ত্রী আইনি পথে আদায় করতে পারবেন।

