ফৌজদারি মামলায় ভুয়া সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি নিয়ে বছরের পর বছর ভোগান্তি চলছেই। নিরীহ মানুষ এই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভুয়া ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়ে অনেককে হাজতবাসেও যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের জীবন। ভুয়া ওয়ারেন্ট তৈরির সঙ্গে আদালতের কিছু কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
শুধু ওয়ারেন্ট নয়, মামলার সমন নিয়েও তৈরি হয় জটিলতা। আদালত থেকে সমন জারি হলেও তা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছাতে নানা ধাপ পেরোতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় কোথায় ত্রুটি হচ্ছে, তা অনেক সময় অদৃশ্য রয়ে যায়। এসব অনিয়ম ও হয়রানি ঠেকাতে এবার শত বছরের পুরনো পদ্ধতির পরিবর্তন আসছে। সমন ও ওয়ারেন্ট পাঠানো হবে অনলাইনে।
ফৌজদারি মামলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনার জন্য পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (সিডিএমএস) বিচারক ও সরকারি আইন কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার কাজ চলছে। সিডিএমএস হলো পুলিশের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ, যেখানে মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
সিডিএমএসে প্রবেশাধিকার নিয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা, আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ঐকমত্যে পৌঁছে এখন সফটওয়্যার রি-অ্যারেঞ্জের কাজ চলছে। বিচারক ও আইন কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা আইডি ও পাসওয়ার্ড তৈরি করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে বিচারকরা সরাসরি সিডিএমএসে এফআইআর, তদন্ত অগ্রগতি, চার্জশিটসহ সব নথি দেখতে পারবেন। সমন ও ওয়ারেন্টও তারা সরাসরি সিস্টেমে দাখিল করবেন। এতে সংশ্লিষ্ট থানা সহজে নথি হাতে পাবে। ফলে ভুয়া ওয়ারেন্টে হয়রানি বন্ধ হবে। সমন পৌঁছানো নিয়েও আর নাটকীয়তা চলবে না। এমনকি জাল তথ্য দিয়ে জামিন নেওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রথম বৈঠক হয় আইন মন্ত্রণালয়ে আইন উপদেষ্টার সভাপতিত্বে। এরপর প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীর সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। দুই বৈঠকেই সিডিএমএসে প্রবেশাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “সমন ও ওয়ারেন্ট জারির ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়া চলছে। টেকনিক্যাল কাজ শেষ হলে দ্রুতই বাস্তবায়ন হবে। এতে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি অনেকটাই কমে আসবে।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “এটি হবে নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রতীকী পদক্ষেপ। বিচারকাজ দ্রুত হবে, ভোগান্তি কমবে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।”
ভুয়া ওয়ারেন্টের কারণে মানুষ কীভাবে হয়রানির শিকার হন, তার উদাহরণ অগণিত। গত বছরের ১৮ জুন সুজন কুমার বসুর নামে জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু হয়। পরে আদালত তদন্তের নির্দেশ দেন। আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে সাভারের আশুলিয়ায়। জমি দখলের উদ্দেশ্যে আওলাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে পরপর পাঁচটি ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করে টানা ৬৮ দিন হাজতে রাখা হয়। পরে তার স্ত্রী উচ্চ আদালতে রিট করলে হাইকোর্ট তাকে মুক্তি দেন।
এমন ঘটনাই হাইকোর্টকে ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর সাত দফা নির্দেশনা দিতে বাধ্য করে। তাতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সময় নির্দিষ্ট তথ্য, সিলমোহর, স্বাক্ষর এবং যোগাযোগ নম্বর ব্যবহারের মতো নানা শর্ত দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্দেশনার পরও ভুয়া ওয়ারেন্ট বন্ধ হয়নি।
আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিজিটাল সিস্টেম চালু হলে সমন জারি চেপে রাখা, ফরোয়ার্ডিংয়ে জালিয়াতি ও ভুয়া ওয়ারেন্ট ইস্যু বন্ধ হবে। তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণের অগ্রগতি মনিটরিংয়ের আওতায় আসবে। পুলিশ ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সাক্ষী হাজির করা নিয়ে যে টানাপোড়েন রয়েছে, তা কমবে। সবাইকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব হবে। ভুয়া ওয়ারেন্ট ঠেকাতে হাইকোর্টের নির্দেশনা কার্যকর না হলেও সরকারের নতুন এই ডিজিটাল পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে হয়রানি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

