বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আপিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিম্ন আদালত বা কর্তৃপক্ষের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে সেটিই আপিল নামে পরিচিত।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপিল হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি পথ। নিম্ন আদালতের রায় নিয়ে যদি কোনো পক্ষ আপত্তি তোলে, তবে তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। এতে নতুন করে যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ থাকে। অনেক সময় প্রমাণ বা সাক্ষ্য সঠিকভাবে বিবেচনা হয়নি বলে মনে হলে, তাতেও আপিল করা যায়।
বাংলাদেশে আপিল প্রক্রিয়া তিন স্তরে পরিচালিত হয়। প্রথমে মামলা হয় নিম্ন আদালতে। সেই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করা যায়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধেও আবার আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ আছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগই দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এখানেই চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়। আইনজীবীরা মনে করেন, আপিল বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি নিরাপত্তা বলয়। এটি না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য রায় চূড়ান্ত হয়ে যেত। তাই বিচারব্যবস্থায় আপিল প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
আপিল কি?
নিম্ন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত কোন মামালার রায়ের বিরুদ্ধে যে কোন সংক্ষুদ্ধ পক্ষ উক্ত মামলার রায় বাতিল ব্য সংশোধন বা বিচারিক পর্যালোচনার জন্য উচ্চ আদালতে মেমোরেন্ডাম আকারে যে দরখাস্ত দাখিল করা হয়, তাকে আপিল বলে।
কে দায়ের করবেঃ
আপিলকারী বা তার আইনজীবী আপিল দায়ের করবে। যে আদেশের/রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে তার ১টি নকল আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত করতে হবে। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে আপিল লিখিত আবেদনপত্রের আকারে করতে হয় অর্থাৎ Petition of Appeal বলে। তবে দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে Memorandum (স্মারকলিপি) of Appeal বলে।
যে সকল ক্ষেত্রে আপিল চলবে:
ক্রোককৃত সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের আবেদন অগ্রাহ্য হলে তার বিরুদ্ধে আপিল, ক্রোককৃত সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য ৮৯ ধারায় যে দরখাস্ত করা হয়েছে, তা যদি নাকচ হয় তাহলে আপিল করা যাবে। শান্তি রক্ষা বা সদাচরনের মুচলেকার আদেশের বিরুদ্ধে আপিল: শান্তিরক্ষার বা সদাচরনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট ১১৮ ধারার অধীনে মুচলেকার আদেশ দিলে তার বিরুদ্ধে দায়রা আদালতে আপিল চলবে।
কতিপয় ক্ষেত্রে আপিলের বিশেষ অধিকার: একাধিক ব্যক্তি একই বিচারে দণ্ডিত হয় তখন তাদের যেকোন একজনের বিরুদ্ধে আপিলযোগ্য রায় বা আদেশ দিলে সকলে আপিল করতে পারবে।
- দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল
- দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট প্রদত্ত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল
- দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক দেয়া শান্তির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট।
- যুগ্ম দায়রা জজ বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট প্রদত্ত দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল
- যুগ্ম দায়রা জজ বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে দায়রা জজের নিকট আপিল করতে হয়।
- তবে যুগ্ম দায়রা জজ ৫ বছরের বেশি কারাদণ্ড দিলে আপিল যাবে হাইকোর্ট বিভাগে।
- পর্যালোচনা: নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা।
- সংশোধন: যদি সিদ্ধান্ত ভুল হয়, তবে উচ্চতর আদালত সেটি সংশোধন করতে পারে বা পরিবর্তিত করতে পারে।
- ন্যায়বিচার: একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে সুরক্ষা দেওয়া।
- আবেদন: নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয় এবং আপিল আবেদনের আর্জির কপি জমা দিতে হয়।
- সময়সীমা: তামাদি আইন অনুযায়ী, জেলা জজের কাছে আপিলের জন্য সাধারণত ৩০ দিন এবং হাইকোর্ট বিভাগে আপিলের জন্য ৯০ দিন সময় থাকে।
- আদালত: জেলা জজ, হাইকোর্ট বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট আপিল আদালত হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল ও ভূমি আপিল বোর্ডের মতো বিশেষায়িত আদালতও রয়েছে।
আপিলের প্রকারভেদ:
- ফৌজদারি আপিল: কোনো দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে বা সরকারি আইনজীবীকে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার দেওয়া হয়।
- দেওয়ানি আপিল: সম্পত্তি, চুক্তি, বা অন্যান্য দেওয়ানি সংক্রান্ত বিষয়ে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়।
- প্রশাসনিক আপিল: কোনো সরকারি সংস্থার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করা হয়।
যে সকল ক্ষেতে আপিল চলবে না: আসামি দোষ স্বীকার করার ফলে দণ্ডপ্রাপ্ত হলে আপিল চলবে না। আসামি দোষ স্বীকার করলে এবং উক্ত স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দায়রা আদালত বা যে কোন মেট্রোপলিটন বা কোন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট তাকে দণ্ডদান করলে দণ্ডের পরিমাণ বা আইনগত যৌক্তিকতা ব্যতিত উক্ত দণ্ডের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলবে না।
ধারা ৪১৩: তুচ্ছ মামলায় আপিল নেই:
- দায়রা আদালত অনধিক ১ মাস কারাদণ্ড দিলে আপিল চলবে না।
- দায়রা আদালত বা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট অনধিক ৫০ টাকা জরিমানা করলে আপিল চলবে না।
- মূল শান্তি স্বরুপ কারাদণ্ড না দিয়ে জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ডের আদেশ দিলে তার বিরুদ্ধে আপিল চলবে না।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আপিল শুধু আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। নিম্ন আদালতের কোনো রায়ে ভুল বা অন্যায় হলে তা সংশোধনের সুযোগ দেয় এই ব্যবস্থা। এতে বিচারপ্রার্থীরা আশ্বস্ত হন এবং আদালতের প্রতি আস্থা বজায় থাকে। তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও নাগরিকের অধিকার রক্ষায় আপিল প্রক্রিয়া অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

