সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থঋণ আদালতগুলোতে জমে আছে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ সংশ্লিষ্ট মামলা। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশের ৭৪টি অর্থঋণ আদালতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বন্ধকী সম্পত্তি দখল সনদের জন্য করা আবেদনের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৪০০। এসব আবেদনের সঙ্গে জড়িত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, নিলাম ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হলো— অনেক জমি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে বন্ধক রাখা হয়েছিল। আবার অনেক জমিতে পারিবারিক বা উত্তরাধিকার জটিলতা আছে, কোথাও সরকারের খাস জমিও জড়িয়ে আছে। সাধারণত তিনবার নিলাম ডাকা হলেও ক্রেতা না মিললে ব্যাংক আদালতের মাধ্যমে সম্পত্তির দখল সনদ চায়। এতে সনদ পেলে ব্যাংক সম্পত্তি ব্যবহার, ভাড়া বা পরে বিক্রি করতে পারে।
অগ্রণী ব্যাংকের একটি মামলার ঘটনাতেই পরিস্থিতি স্পষ্ট। চলতি বছরের মে মাসে গাজীপুরের রূপালী বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে ১৫৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ মামলায় জয়ী হয়ে ব্যাংকটি ছয় একর জমি নিলামের জন্য আদালতের রায় পায়। জুন, জুলাই ও আগস্টে তিন দফা নিলাম হলেও কোনো ক্রেতা মেলেনি। ফলে ব্যাংক এখন আদালতের কাছে দখল সনদ চেয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের আইনজীবী তরিকুল ইসলাম বলেন, জমিটি এমডির নামে নয়, পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে। এর মধ্যে প্রায় এক একর খাস জমিও আছে। ব্যাংক যে ১৫৬ কোটি টাকা মূল্য ধরে বন্ধক নিয়েছিল— বাজারে এর দাম ৭০–৭৫ কোটি টাকার বেশি নয়। তাই কোনো বিডার এগিয়ে আসেনি। তিনি আরও জানান, জমিটি নিলামে কিনলেও দলিল নিয়ে মিউটেশনে আইনি জটিলতা তৈরি হবে। কারণ উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিকানা স্পষ্ট নয়। তাছাড়া খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় ক্রেতারা জমি দখলে রাখতে পারবেন কি-না সেটিও অনিশ্চিত।
এর আগে মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) প্রতিবেদনে এই ঋণ অনুমোদনে নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালে রূপালী বিল্ডার্সকে ৯১ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। জামানতের সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ছিল মাত্র ৪০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা ঋণের তুলনায় অনেক কম।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার সাতটি অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকগুলো ৪৭৬টি দখল সনদের আবেদন করেছে। এতে জড়িত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে আবেদনের সংখ্যা ছিল ৬২০টি, যেখানে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৩ সালে আবেদন হয়েছিল ৫১১টি, যা ছিল প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার ঋণ সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশের ৭৪টি অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৭৬ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৪০০ আবেদন রয়েছে দখল সনদের জন্য।
২০২৪ সালে ঢাকার অর্থঋণ আদালত-৪ মোট ১২৩টি মামলার রায় দেয়। এগুলোর সঙ্গে জড়িত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। রায়ে নিলামের মাধ্যমে টাকা উদ্ধারের নির্দেশ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্রেতা পাওয়া যায়নি। আদালতের এক কর্মকর্তা জানান, রায়ের পর ৮১টি মামলায় নিলামে ক্রেতা না পাওয়ায় ব্যাংক আদালতে আবেদন করেছে জামানত নিজেদের নামে নেয়ার জন্য। মাত্র ৮টি ছোট ঋণ আদায় হয়েছে নিলামের মাধ্যমে।
জনতা ব্যাংক একবার মাত্র ৩ লাখ টাকার ঋণ উদ্ধারে নিলামে সফল হয়েছিল। এবি ব্যাংক ২০০৬ সালে ভাটারার একটি বাড়ি বিক্রি করে আংশিক ঋণ উদ্ধার করে। আবার পূবালী ব্যাংক শনির আখড়ায় ৬৪ কোটি টাকার ঋণ আদায়ের মামলায় রায় পেলেও তিনবার নিলাম ব্যর্থ হওয়ার পর তিনটি বাড়ি নিজেদের নামে দলিল করে নেয়। পরে সেগুলো ভাড়া দেওয়া হয়।
হলমার্ক গ্রুপের সোনালী ব্যাংকের ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনাতেও একই সমস্যা দেখা যায়। আদালতের মাধ্যমে ব্যাংক ৩,৮৩৪ শতক জমির মালিকানা পেলেও সেটি পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকও একই অভিজ্ঞতার মুখে পড়ে। এইচআরসি গ্রুপের কাছে ১২১ কোটি টাকার ঋণ উদ্ধারে বারবার নিলাম ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত আদালতের মাধ্যমে সম্পত্তি নিজেদের দখলে নেয় ব্যাংকটি।
মৌজা রেট ও বাজারদরের অমিল নিলাম ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ। যেমন গুলশানে ১০ কোটি টাকার ফ্ল্যাটের মৌজা দর থাকে মাত্র ৫০ লাখ টাকা। এতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আগে নিয়ম ভেঙে এসব সম্পত্তি কেনা যেত। এখন আর কেউ ঝুঁকি নিচ্ছে না।
এবি ব্যাংকের একটি মামলায় ৫০ লাখ টাকার ঋণ সুদে বেড়ে ২ কোটি হয়। আদালত ভাটারার একটি বাড়ি ব্যাংকের অনুকূলে দেয়। ২০০৬ সালে বিক্রি করে ব্যাংক ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা উদ্ধার করে। বাকি টাকা মওকুফ করে দেয়। ব্যাংক আইন বিশেষজ্ঞ এমরান আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, নিলাম ব্যর্থ হলে ব্যাংক সম্পত্তি নিজেদের নামে নেয়। এতে মূল ঋণের টাকা কিছুটা উদ্ধার হয়, কিন্তু সুদ প্রায়শই থেকে যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের ২০২৩ সালের গবেষণায় বলা হয়, জামানতের সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের মাত্র ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ উদ্ধার করতে পারে। মূল টাকা কখনো ওঠে, কিন্তু সুদ থেকে যায়।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ঋণের বিপরীতে বন্ধকী সম্পত্তি বিশ্বজুড়েই নিরাপদ ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় ঋণগ্রহীতা প্রতারণা করে এবং ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তারাও এতে জড়িত। তিনি বলেন, সম্পত্তি বন্ধকের আগে দলিল ও বাজারমূল্য সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও উচিত এসব যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া। তবেই সমস্যা কমবে এবং ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কিছুটা স্বস্তি পাবে।

