প্রকাশ্যে জোর করে চুল কেটে দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটি বলছে, এ ধরনের আচরণ বেআইনি, অমানবিক এবং মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে আসক জানায়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে কয়েকজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে এক পথচারীর মাথার চুল জোরপূর্বক কেটে দিচ্ছেন। সংগঠনটির মতে, এমন ঘটনা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, ব্যক্তির মর্যাদার ওপরও সরাসরি আঘাত।
সংবিধানের উদাহরণ টেনে আসক জানায়, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রতিটি নাগরিককে আইনের আশ্রয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার দিয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদ জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে এবং ৩৫ অনুচ্ছেদ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তাই প্রকাশ্যে কারও চুল কেটে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, সাধুর মতো দেখতে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে তিনজন লোক জোর করে চুল কেটে দিচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে তাঁকে অনেকে পাগল বললেও ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি বারবার চেষ্টা করছেন নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে কিন্তু শক্তিতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে পেরে উঠতে পারেননি।
তিনজন যুবক দেখতে সবল ও ইসলামি বেশধারী। তাঁদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত নয়। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁরা কোনো সংগঠনের হয়ে কাজ করতে পারেন। তবে তাঁরা যেভাবে ওই বয়স্ক মানুষটির চুল ও দাড়ি ধরে টেনে কেটে দিচ্ছিলেন, তা সামাজিকভাবে নিন্দনীয় এবং অমানবিক আচরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভিডিওতে স্পষ্ট শোনা যায়, নির্যাতনের শেষ দিকে ওই মানুষটি অসহায়ের মতো বলছিলেন—“আল্লাহ তুই দেহিস।” অর্থাৎ, বিচার তিনি তুলে দিচ্ছিলেন স্রষ্টার হাতে। সমাজের নিপীড়িত মানুষের মতোই তাঁর ভরসা ছিল একমাত্র আল্লাহর কাছে।
এর আগেও ফেসবুকে একই ধরনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, এক বয়স্ক লোককে চুল কেটে দেওয়ার সময় তিনি অনুনয় করছিলেন, “চুল কাটছিস, দাঁড়িও কাটতে হবে।” তখন চুল কাটতে থাকা ব্যক্তিরা তাকে ব্যঙ্গ করে বলছিলেন, “তুমি তো নামাজ-কালাম পড়ো না, দাঁড়ি কাটলেই কি আর চুল কাটলেই কি!” একাধিক ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, ধর্মীয় পোশাকধারী লোকেরা কেন এমন আচরণ করছেন, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি শুধু ব্যক্তিগত নিপীড়ন নয়, বরং সমাজে সহনশীলতার অভাব ও অসহায় মানুষের প্রতি অবমাননার একটি প্রতিচ্ছবি। এমন কর্মকাণ্ড ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সামাজিক শান্তি বিনষ্টের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও অনেকে মন্তব্য করছেন।

ঘটনা দুটির ভিডিও প্রায় একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও এ ধরনের ভিডিও নতুন নয়। গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিতভাবেই এমন ভিডিও সামনে আসছে। কয়েক বছর আগেই এর সূচনা হলেও গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এর মাত্রা যেন আরও বেড়ে গেছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
শুরুতে একটি নির্দিষ্ট দলের বেশ কয়েকটি ভিডিও ফেসবুকে প্রচার পায়। সেসব ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁরা মানুষকে ধরে চুল কেটে দিচ্ছেন, গোসল করাচ্ছেন, নতুন জামাকাপড় পরিয়ে দিচ্ছেন। পুরো ঘটনাটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হতো। এই কনটেন্টগুলোতে প্রচুর ভিউ আসত। মানুষ আলোচনা করত আর ভিডিও প্রকাশকারীরা সেখান থেকে অর্থ উপার্জন করতেন।
তবে এটিও সত্য যে, এ ধরনের কনটেন্ট শুধু বাংলাদেশেই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোতেও দেখা যায়। সেখানে অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর গৃহহীন মানুষের কাছে গিয়ে তাঁদের অযত্নে বেড়ে ওঠা চুল-দাড়ি কেটে দেন, পরিপাটি জামাকাপড় পরিয়ে দেন, আর্থিক সহায়তাও করেন। সেই ভিডিওগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পার্থক্য হলো, পশ্চিমা দেশগুলোর ভিডিওতে উভয় পক্ষের সম্মতি থাকে। যাঁকে সাহায্য করা হচ্ছে তিনি রাজি থাকেন। ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁর মুখে হাসি ফুটে ওঠে, যা দর্শকের কাছে ইতিবাচক ও প্রশান্তিকর মনে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর চিত্র ভিন্ন। এখানে ভুক্তভোগীরা বারবার অনুরোধ করলেও জোর করে তাঁদের চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া হচ্ছে। আর সেই অসহায় মুহূর্তগুলো ভিডিও করে প্রচার করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে মানবিকতার প্রশ্ন যেমন উঠছে, তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক সহনশীলতা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন কারও সম্মতি ছাড়াই তাঁর ওপর জবরদস্তি করা হয়। বাংলাদেশের কনটেন্ট নির্মাতারা প্রায়ই এই সীমারেখা অতিক্রম করছেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁরা নির্দিষ্ট একজনকে টার্গেট করে হঠাৎ ছুটে গিয়ে ধরে ফেলেন, তারপর জোর করে তাঁর চুল–দাড়ি কেটে দেন। পুরো প্রক্রিয়াটি স্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন।
দেশে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা নেই। এ সুযোগে অনেকে ইচ্ছেমতো কনটেন্ট তৈরি করছেন। এতে শুধু ভুক্তভোগীরা মানসিকভাবে আঘাত পাচ্ছেন না, বরং একে একধরনের ‘ভিউ ব্যবসা’ হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ কেউ যুক্তি দেন, ভবঘুরে মানুষকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সম্মতি ছাড়া এমন জোরজবরদস্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু ভুক্তভোগীকে আতঙ্কিত করে না, বরং সমাজে নেতিবাচক প্রভাবও ফেলে। এসব কনটেন্ট এবং এর প্রতি কিছু মানুষের সমর্থন ভবঘুরে, ফকির কিংবা সমাজে অন্যদের মতো জীবনযাপন করতে না পারা মানুষদের প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে। এতে তাঁদের জীবন আরও বিপন্ন হচ্ছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু অনৈতিকই নয়, সংবিধান ও মানবাধিকার পরিপন্থী অপরাধও বটে।
যাঁরা এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করছেন, তাঁদের কেউ কেউ ইসলামি সংগঠন বা সমাজসেবামূলক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত। আবার অনেকেই কোনো সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তবে ভিডিওগুলোতে একটি বিষয় স্পষ্ট—টার্গেট করা হচ্ছে মূলত ভবঘুরে, মাজার–খানকা ঘরানার ফকির বা পাগলবেশে থাকা মানুষদের। তাঁদের ধরে নিয়ে জোর করে চুল কেটে দেওয়া হচ্ছে এবং তা ভালো কাজ হিসেবে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর সম্মতির কোনো গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না। বরং কনটেন্ট প্রকাশের পর দেখা যায়, কিছু মানুষ প্রকাশ্যে এর পক্ষে মত দিচ্ছেন। তাঁদের এই সমর্থন কনটেন্ট নির্মাতাদের আরও উৎসাহিত করছে একই ধরনের ভিডিও বানাতে কিন্তু এর ফলে সমাজে ভয়ংকর এক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। ভবঘুরে, ফকির বা যাঁরা সমাজের মূল স্রোতের মতো জীবনযাপন করেন না—তাঁদের প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে। এতে তাঁদের জীবন আরও বিপন্ন হয়ে পড়ছে। অথচ সংবিধান এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি স্পষ্টতই অপরাধ।
গত এক বছর ধরে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পত্রপত্রিকায় নাগরিক সমাজের অনেকেই এই জবরদস্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু কার্যত কোনো পরিবর্তন আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চুল–দাঁড়ি কেটে দেওয়ার ঘটনাই একমাত্র নয়, সাম্প্রতিক সময়ে আরও নানা ধরনের উপদ্রব কনটেন্ট আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেখা যায়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা যৌনকর্মীদের এক ব্যক্তি পিটিয়ে সরিয়ে দিচ্ছেন, আর সেটিকে ভিডিও করে প্রকাশ করেছেন কনটেন্ট হিসেবে।
এরপর পিকনিক করতে যাওয়া নারীদের পোশাক পছন্দ হয়নি বলে লঞ্চের ডেকে প্রকাশ্যে তাঁদের মারধর করা হয়। বহু মানুষের সামনে এমন নৃশংসতা ঘটলেও সেটিও ‘ভালো কাজ’ দেখানোর আড়ালে প্রচারিত হয়েছে। আবার যৌন হেনস্থার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া একজনকে ফুলের মালা পরিয়ে থানার গেট থেকে বের করে আনার মতো ঘটনাও কনটেন্টে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই ধারা স্পষ্ট। কিছু লোক নিজেদের হাতে ভালো–খারাপের পাল্লা মেপে খারাপ দমনের দায়িত্ব নিচ্ছেন। আবার তাঁদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সমর্থনও জুটছে, কখনো সামাজিকভাবে, কখনো রাজনৈতিকভাবেও। ফলে দুর্বল ও অসহায় মানুষরা আরও বেশি বিপন্ন হয়ে পড়ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কনটেন্ট শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং সমাজে সহিংসতাকে বৈধতা দিচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও বাড়ছে। মানুষকে বিপন্ন করে তোলার এই রাজনীতি এখন আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেই, আক্রান্ত হচ্ছে ধর্মীয় স্থাপনাও। বিশেষ করে মাজারগুলো। অভিযোগ তোলা হচ্ছে—মাজারে নাকি শিরক হয়, মদ–গাঁজার আসর বসে। এই যুক্তি দেখিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এক গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে মাজার ভাঙচুর চালিয়ে যাচ্ছে।
ওই বছরের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে ৮০টি মাজার ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। সর্বশেষ দুই দিন আগে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার আমানিপুর গ্রামে মরহুম কফিল উদ্দিন শাহ নামের এক পীরের আস্তানা ভাঙা হয়। নেত্রকোনার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার তিন শতাধিক লোক নৌকায় করে এসে ওই আস্তানায় হামলা চালায়। শুধু ভাঙচুর নয়, সেখানে আগুনও দেওয়া হয়। এর আগে কুমিল্লার হোমনায় একই কফিল উদ্দিন শাহের মূল মাজারসহ আশপাশের আরও তিনটি মাজারে হামলা হয়। অভিযোগ ছিল—ফেসবুকে হজরত মুহাম্মদ (সা.)–কে অবমাননা করা হয়েছে। অথচ ওই অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আগেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল।
নেত্রকোনার ঘটনায় পুলিশ শুধু থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে। তাতে কোনো নাম উল্লেখ নেই। যদিও কুমিল্লার ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, মাজারে হামলার অধিকাংশ ঘটনায় বিচারহীনতার প্রবণতা প্রকট। এমনকি এ হামলার পক্ষেও জনসমর্থন পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন, মাজারে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে বিকল্প কী? তবে পাল্টা প্রশ্নও উঠছে—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কি রাষ্ট্র এমন কর্তৃত্ব দিয়েছে যে, তারা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর মেলে না।
ধর্ম বোঝাপড়া, ভালো–খারাপের মানদণ্ড কিংবা সামাজিক দায়বোধ—সব মানুষের ক্ষেত্রে সমান হয় না। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং ধর্মভেদে এসব ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন কেউ নিজের চিন্তা বা বিশ্বাস জোর করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া চুল কাটার ভিডিওগুলোই সেই জবরদস্তির প্রতিফলন।

কোনো বিষয় অপরাধ মনে হলে তার সঠিক পথ হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ জানানো। রাষ্ট্র তার বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো নাগরিকের অধিকার নেই অন্য নাগরিককে ধরে নিয়ে জোর করে চুল কেটে দেওয়ার কিংবা কোনো মাজার ভাঙচুর করার। এই অধিকার শুধু মানবাধিকার বা সেক্যুলার মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে নেই তা নয়, ধর্মীয় দিক থেকেও নেই। ধর্ম কারও ওপর জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়ার শিক্ষা দেয় না। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার আয়াতে স্পষ্ট বলা আছে—“ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।” ফলে ধর্মের দায় দেখিয়ে অন্যকে আঘাত করার কোনো অনুমতি ইসলামও দেয় না।
সাম্প্রতিক সহিংসতা ও জবরদস্তিমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে বড় সমস্যাটি হচ্ছে—অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। কোথাও সামান্য জমায়েত বা কিছু মানুষের মতামত একত্র হলেই সরকার তা ভয় পাচ্ছে। কারণ, এই সরকারের নিজস্ব কোনো জনসমর্থন নেই। ফলে সবাইকেই নিজেদের সমর্থক ভেবে আশকারা দিচ্ছে। এর ফলেই ধর্মীয় বা পরিচয়ে যাঁরা সংখ্যালঘু, তাঁদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের মত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রবণতা ভালো কিছু বয়ে আনবে না। কারণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যতই বাড়তে থাকে, সেটি ধীরে ধীরে বড় গোষ্ঠী থেকে সঙ্কুচিত হয়ে নির্দিষ্ট কিছু মানুষ, কিছু পরিবার, এমনকি এক ব্যক্তির হাতে গিয়ে ঠেকে।
এই সংকোচন এড়াতে প্রয়োজন সামাজিক ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দেওয়া। চিন্তা, আদর্শ ও পরিচয়ের বহুমাত্রিকতাকে মূল্য দেওয়া। সবচেয়ে জরুরি হলো—মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে আওয়াজ তোলা। নতুবা বর্তমান বাস্তবতায় কেবল কোনো একটি গোষ্ঠী নয়, আমরা সবাই আক্রান্ত হব।
আসকের মতে, এমন ঘটনা সমাজে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়। তারা মনে করে, দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন কোনো নাগরিক এ ধরনের অপমানজনক ঘটনার শিকার না হন তা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

