ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংঘটিত সাইবার অপরাধ দমন ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ২০২৩ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনের নাম সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩।
সরকারের যুক্তি অনুযায়ী, আগের আইন অনেক সময় বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি করত এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। নতুন আইনটি ডিজিটাল অপরাধ রোধ, তথ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর এবং যুগোপযোগী প্রণীত। বর্তমানে ফিশিং, হ্যাকিং, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনলাইন অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর মতো অপরাধের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এই প্রেক্ষাপটে নতুন আইন ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ আন্তর্জাতিক মান ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি। এর মাধ্যমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
সাম্প্রতিক অন্তবর্তীকালীন সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ বাতিল করে নতুন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করেছে। নতুন অধ্যাদেশের লক্ষ্য সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন এবং এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি এর সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য বিষয়ক বিধানও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে “সাইবার সুরক্ষা” বা “নিরাপত্তা” বলতে মূলত ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার বা কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তাকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ অনলাইন বা ডিজিটাল পরিবেশে তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারাগুলো সাইবার অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে।
ধারা ১৭ অনুযায়ী, কেউ যদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশ বা হ্যাকিং করে, তবে তিনি অনধিক ৫ থেকে ৭ বছর কারাদণ্ড, বা ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এটি অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
২০ ধারা অনুসারে, সাইবার স্পেসে জুয়া খেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অনলাইনে জুয়া খেলায় সর্বাধিক ২ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া কেউ যদি জুয়ার জন্য কোনো পোর্টাল, অ্যাপ বা ডিভাইস তৈরি বা পরিচালনা করেন, খেলায় অংশগ্রহণ, সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান করেন, বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ বা প্রচার করেন, তাহলে উক্ত কার্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য সর্বাধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
২১ ধারা অনুযায়ী, কেউ যদি সাইবার স্পেস ব্যবহার করে জালিয়াতি করেন, তবে সর্বাধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
২২ ধারা অনুযায়ী, কেউ যদি সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণা করেন, তবে সর্বাধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হবেন। এই ধারা অনুসারে প্রতারণা জামিন অযোগ্য অপরাধ।
ধারা ২৩ অনুযায়ী, কেউ যদি রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার বা জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি সঞ্চার করার অভিপ্রায়ে সাইবার সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘটন করেন, তবে তিনি সর্বাধিক ১০ বছর কারাদণ্ড, বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হবেন।
ধারা ২৫ অনুযায়ী, অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে জ্ঞাতসারে অন্যকে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত তথ্য, ভিডিও, অডিও বা গ্রাফিকস প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, অথবা এই কাজের হুমকি প্রদান করেন, তাহলে তিনি সর্বাধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো অপরাধ নারী বা ১৮ বছরের কম শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়, তবে দণ্ড আরও কঠোর হবে। এর জন্য সর্বাধিক ৫ বছর কারাদণ্ড, বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী যৌন হয়রানি অর্থে:
- (অ) সাইবার স্পেসে বারংবার নগ্ন ছবি চাওয়া, প্রশাসনিক বা পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাইবার স্পেসে অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া।
- (আ) সাইবার স্পেসে কোনো ব্যক্তির যৌনাঙ্গের ছবি বা যৌন উদ্দীপক উপাদান বা পর্নোগ্রাফিক উপাদান অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রেরণ করা, কারো অনুমতি ব্যতীত তার ছবি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফিক বা যৌন উপাদানে রূপান্তর করা।
- (ই) সম্পর্কের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ার কারণে হুমকি, প্রলোভন বা চাপের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা।
- (র) রিভেঞ্জ পর্ন অর্থ, কোনো ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া তার ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে অন্তরঙ্গ বা ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা অনুরূপ তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছড়িয়ে দেওয়া।
এবং ব্ল্যাকমেইলিং বলতে বোঝানো হয়েছে এমন হুমকি বা ভীতি প্রদর্শন, যার মাধ্যমে কেউ অন্যকে তার গোপন তথ্য প্রকাশের বা ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে বেআইনি সুবিধা, সেবা বা কোনো কার্য সম্পাদনে বাধ্য করে। ধারা ২৬ অনুযায়ী, কেউ যদি সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত বিষয়ে সহিংসতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশ করেন, তাহলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে বলা হয়েছে, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে, জ্ঞাতসারে বা ছদ্ম পরিচয়ে নিজের বা অন্যের আইডি ব্যবহার করে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণামূলক বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করলে, যা সহিংসতা সৃষ্টি বা উদ্বেগ বৃদ্ধি করে, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দেয়, তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য সর্বাধিক ২ বছর কারাদণ্ড, বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সদ্য প্রণীত অধ্যাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ পাবেন। পাশাপাশি কেউ যদি অন্যের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন, তার জন্যও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধারা অনলাইন সহিংসতা, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, ব্ল্যাকমেইলিং ও মিথ্যা মামলা প্রতিরোধে কার্যকর হবে এবং ডিজিটাল স্পেসকে নিরাপদ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি অনলাইন অপরাধ শনাক্ত, প্রতিরোধ, দমন ও বিচারে স্পষ্ট বিধান দিয়েছে। অপরাধের ধরণ অনুযায়ী হ্যাকিং, জুয়া, জালিয়াতি, প্রতারণা, সাইবার সন্ত্রাস, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং এবং ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে শাস্তি আরও কঠোর। অধ্যাদেশটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ এবং মিথ্যা মামলা দায়েরের জন্যও শাস্তি প্রদানের সুযোগ দিয়েছে। এই অধ্যাদেশ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে অনলাইন নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং সাইবার অপরাধ দমন হবে।

