বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ সালে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ বাতিল করে পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ পাস করেছে। নতুন আইন অনুযায়ী, পারিবারিক আদালত ধারা-৫ এর অধীনে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে বর্ণিত বিধানাবলির সাপেক্ষে নিম্নলিখিত বিষয় সম্পর্কিত সমস্ত মামলা গ্রহণ, বিচার ও নিষ্পত্তির একক ক্ষমতা রাখে। বিষয়গুলো হলো:
- বিবাহ বিচ্ছেদ
- দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার
- দেনমোহর
- ভরণপোষণ
- শিশু সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান
দেনমোহর ও ভরণপোষণ মামলা:
পারিবারিক আদালতে দেনমোহর, ভরণপোষণ ও খোরপোষ সংক্রান্ত মামলা দায়ের করা যায়। এই মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার এখতিয়ারাধীন বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হয়।
ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ধারা-৯ অনুসারে, স্বামী যদি স্ত্রীকে ভরণপোষণ প্রদান করতে ব্যর্থ হন, তবে স্ত্রী আইনগতভাবে প্রাপ্য অতিরিক্ত ভরণপোষণ চেয়ে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করতে পারেন। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি, তারা একইভাবে বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতের দ্বারস্থ হয়ে স্বামী থেকে ভরণপোষণ আদায় করতে পারেন।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ধারা-১০ অনুসারে, নিকাহনামা বা বিবাহ চুক্তিতে মোহরানা বা দেনমোহর প্রদানের পদ্ধতি বিস্তারিত উল্লেখ না থাকলে সম্পূর্ণ মোহরানা প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। স্ত্রী নিজে তালাক দিলেও দেনমোহর পাবেন। স্ত্রী মৃত্যুবরণ করলে তার উত্তরাধিকারীরাও দেনমোহর পাওয়ার অধিকার রাখেন এবং আদালতের মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে পারেন।

শিশু সন্তানের ভরণপোষণ ও অভিভাবকত্ব
শিশু সন্তানের ভরণপোষণ নির্ধারণও পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে হয়। বিবাহ বিচ্ছেদের পর সাধারণত ছেলেসন্তান ৭ বছর পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তান বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকে। বাবা সন্তানের জন্য ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকেন। ভরণপোষণ না দিলে মা আদালতের মাধ্যমে এটি আদায় করতে পারেন। বর্তমানে আদালত বিবাহ-বিচ্ছেদের পর সন্তান কার কাছে থাকবে তা নির্ধারণে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন।
মামলা দায়ের ও বিচার প্রক্রিয়া: পারিবারিক আদালতে দেনমোহর, ভরণপোষণ বা শিশু সংক্রান্ত মামলা দায়েরের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
- মামলা দায়ের: যেকোনো পারিবারিক বিষয় যেমন দেনমোহর, ভরণপোষণ বা সন্তানের অধিকার সংক্রান্ত বিরোধের জন্য আধিকারিক পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে হয়। স্ত্রী সাধারণত যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার পারিবারিক আদালত এখতিয়ারভুক্ত।
- নোটিশ পাঠানো: মামলা দায়েরের পর আদালত অভিযুক্ত পক্ষের নিকট নোটিশ পাঠায়। নোটিশে মামলার বিষয়, অভিযোগ ও আদালতের সময়সূচি উল্লেখ থাকে।
- সাক্ষ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন: উভয় পক্ষ আদালতে নিজেদের বক্তব্য, প্রমাণ এবং সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন। প্রয়োজন হলে সাক্ষীদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হয়।
- বিচার ও আদেশ প্রদান: আদালত সব প্রমাণ ও বক্তব্য যাচাই করে বিচার ও আদেশ প্রদান করেন। দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এই পর্যায়ে নির্ধারণ করা হয়।
- আদেশ বাস্তবায়ন ও আইনি বাধ্যবাধকতা: পারিবারিক আদালতের আদেশ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। আদেশ লঙ্ঘন হলে আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আইন অনুযায়ী দেনমোহর, ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ হলে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে আইনগত ও দ্রুত সমাধান সম্ভব। আদালতের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে যে প্রত্যেক পক্ষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং সন্তানের কল্যাণ সর্বোচ্চ প্রাধান্য পাবে।
আইনটি সকল ধর্মের পরিবারকে সমানভাবে সুরক্ষা প্রদান করে। এতে পরিবারে ন্যায্যতা, সন্তানের সুরক্ষা এবং স্ত্রী ও সন্তানদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়। পারিবারিক আদালত, দেনমোহর, ভরণপোষণ ও সন্তানের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো এখন আরও স্পষ্ট, কার্যকর এবং আইনি নিরাপদ হয়ে উঠেছে।

