দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি শোনলেই প্রথম যে ধারণা তৈরি হয় তা হলো—কোনো বড় ঘটনার পর আসামী ধরা পড়েছে এবং তার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। তবে আইন কি সত্যিই তাই বলছে? ১৬৪ ধারার জবানবন্দি কি, কে দিতে পারে, কার নিকট দেওয়া হয়, এবং এর গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া কী—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আইন অনুযায়ী বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন।
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী ১৬৪ ধারার জবানবন্দি একটি পদ্ধতিগত আইন। এতে বলা হয়েছে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি তার নিজস্ব অপরাধের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে পারেন একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট। তবে সকল ম্যাজিস্ট্রেট এই জবানবন্দি গ্রহণ ও লিপিবদ্ধ করার যোগ্যতা রাখেন না। আইন অনুযায়ী, কোনো মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত দ্বিতীয় শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটই এই জবানবন্দি রেকর্ড করার ক্ষমতা রাখেন।
এই জবানবন্দি গ্রহণ করা যেতে পারে বিচার বা তদন্ত শুরু হওয়ার আগে কিংবা পরে, যে কোনো সময়। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শুধুমাত্র আসামী দিতে পারেন। আইনশাস্ত্রে এটিকে ‘বিচারিক দোষস্বীকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে সাধারণ জবানবন্দি এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মধ্যে কিছু পার্থক্য ও ব্যতিক্রম রয়েছে, যা আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ফৌজদারি মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও সব মামলায় এটি বাধ্যতামূলক নয়, আইন অনুযায়ী এটি একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া, যা আসামীর স্বীকারোক্তি আইনসম্মতভাবে রেকর্ড করার মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে সুসংহত করে।
স্বীকারোক্তি হলো একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের সংঘটিত অপরাধের স্বীকৃতি। আর জবানবন্দি হতে পারে স্বীকৃতিমূলক, অস্বীকৃতিমূলক বা বৈরী। তবে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রদত্ত স্বীকারোক্তির গুরুত্ব একরকম নয়। পুলিশকে দেওয়া স্বীকারোক্তি ও বিচারিক দোষস্বীকারের মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যদি আসামী নিজেকে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত স্বীকার করে, তা ইনকাল্পাটরি কনফেশন। আর যদি নিজেকে না জড়িয়ে স্বীকারোক্তি দেয়, তা এক্সকাল্পাটরি কনফেশন বলা হয়। আইন অনুযায়ী, জবানবন্দি গ্রহণ ও লিপিবদ্ধকারী ম্যাজিস্ট্রেটের অপরাধ বিচারের এখতিয়ার বিবেচ্য নয়। তবে এই স্বীকারোক্তি সাক্ষ্যগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হলে এর ওপর ভিত্তি করে আসামিকে সাজা দেওয়া যায়।
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী, জবানবন্দি গ্রহণ ও লিপিবদ্ধকরণের সময় ম্যাজিস্ট্রেটকে ৩৬৪ ধারা অনুসরণ করতে হয়। এর মধ্যে কয়েকটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেমন, জবানবন্দির আগে আসামিকে জানাতে হবে যে তিনি পুলিশ নন, তিনি ম্যাজিস্ট্রেট এবং তার নিকট আসামীকে দোষ স্বীকার করার জন্য আনা হয়েছে। এছাড়া আসামিকে জানাতে হবে যে স্বীকারোক্তি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয় এবং এটি তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। ম্যাজিস্ট্রেট যুক্তিসংগতভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আসামের স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় বলে গ্রহণ করবেন না। সব নিয়ম পালনের পর একটি মন্তব্য বা সনদ দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে যে প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এরপরে জবানবন্দি তদন্তকারী বা বিচারকের কাছে পাঠানো হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি আইনসম্মত এবং স্বচ্ছ হওয়া আবশ্যক।
১৬৪ ধারার জবানবন্দি একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে লিপিবদ্ধ করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের সময় ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৩৬৪ ধারা মেনে চলতে হয়। এই ধারার নিয়ম অনুযায়ী, আসামিকে জিজ্ঞাসিত প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সহ পুরো জবানবন্দি লিখতে হয়। এটি হতে পারে আসামির ভাষায় বা আদালতের ভাষায়। লিখনের পর ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে জবানবন্দি পড়ে শুনাবেন। যদি জবানবন্দি আসামির বোধগম্য ভাষায় না লেখা থাকে, তবে সারমর্ম বোঝানো হবে। এরপর আসামি ও ম্যাজিস্ট্রেট উভয়ই জবানবন্দির শুদ্ধতা ও সত্যতা স্বীকার করে স্বাক্ষর করবেন। এছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট নিশ্চিত করবেন যে প্রক্রিয়ার সব নিয়ম যথাযথভাবে পালিত হয়েছে।
ম্যাজিস্ট্রেটকে নিশ্চিত হতে হয় যে আসামি স্বেচ্ছায়, কোনো প্রভাব বা জোরাজুরি ছাড়া জবানবন্দি দিচ্ছেন। জবানবন্দির শেষে ম্যাজিস্ট্রেট একটি মেমোরেন্ডাম লিখবেন, যেখানে উল্লেখ থাকবে কিভাবে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে আসামী স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিয়েছেন এবং তাদের জবানবন্দি দেওয়ার প্রভাব ও ফলাফল সম্পর্কে জানানো হয়েছে। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি মূলত আসামির স্বেচ্ছায় এবং স্বপ্রণোদিত স্বীকারোক্তি। আমাদের দেশে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পুলিশ রিমান্ড শেষ হওয়ার পর গ্রহণ করা হয়। কেউ পাঁচ দিন রিমান্ডে থাকে, কেউ বা সাত দিন। প্রশ্ন উঠে, রিমান্ড শেষে কি আসামিরা সত্যিই স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন, নাকি রিমান্ডের চাপের প্রভাবে এমন হয়?
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি খাস কামরায়, শুধুমাত্র আসামী ও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে গ্রহণ করা হয়। কোনো পুলিশ বা তৃতীয় পক্ষ এই কক্ষের ভিতরে থাকতে পারবে না। জবানবন্দি শুধুমাত্র ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে রেকর্ড হয়। ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে যথেষ্ট সময় (প্রায় ৩ ঘণ্টা) চিন্তা-ভাবনার জন্য দেবেন এবং এই সময়ও আসামী কক্ষেই থাকবেন। এর ফলে স্বীকারোক্তি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং চাপমুক্ত পরিবেশে নেওয়া হয়। যদিও বাস্তবে আমাদের দেশে আসামীকে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কপি প্রদত্ত বা দেখানো হয় না, কিন্তু সাক্ষ্য আইনের দিক থেকে এটি একটি পাবলিক ডকুমেন্ট। আইন অনুসারে আসামিপক্ষ চাইলে জবানবন্দির কপি পাওয়ার অধিকার রাখে।
যে মামলায় ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দেওয়া হয়, সেই জবানবন্দি গ্রহণ ও লিপিবদ্ধকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে বিচারিক আদালতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে গণ্য করা হয়। বিচারিক সমন প্রাপ্ত হলে তিনি উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য থাকেন। এই পরিস্থিতিতে আসামী পক্ষ তার বিরুদ্ধে জেরা করার আইনত অধিকার রাখে। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ অনুযায়ী, ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রদানের পর যেকোনো সময় আসামী আবেদন করে তা প্রত্যাহার করতে পারেন। এই আবেদন করলে জবানবন্দি ‘প্রত্যাহারকৃত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ বা রিট্রাক্টেড কনফেশন হিসেবে চিহ্নিত হয়। এছাড়া, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামি পরীক্ষার পর বা সাফাই সাক্ষীর সময়েও জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন।
১৬৪ ধারার জবানবন্দি মূলত আসামির স্বেচ্ছায়, স্বপ্রণোদিত এবং কোনো ভুল বোঝাবুঝির কারণে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক বয়ান। তবে দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পুলিশ রিমান্ড শেষ হওয়ার পর গ্রহণ করা হয়। কেউ পাঁচ দিন রিমান্ডে থাকেন, কেউ সাত দিন। প্রশ্ন উঠে, রিমান্ড শেষে কি আসামিরা সত্যিই স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন, নাকি রিমান্ডের চাপের কারণে অনুতপ্ত হয়ে জবানবন্দি দেন?
হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, যদি পুলিশ রিমান্ডে কোনো ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ থাকে, তাহলে ওই ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এভিডেন্স হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। এমন পরিস্থিতিতে জবানবন্দির কোনো আইনি মূল্য নেই। এ বিষয়টি আমাদের চলমান তদন্ত ব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রশ্ন তোলে। ১৬৪ ধারার জবানবন্দি সর্বদা বিচারের জন্য মুখ্য বিষয় নয়। আইন অনুযায়ী, এটি শুধু একটি প্রক্রিয়াগত সাক্ষ্য, কিন্তু সবসময়ই সত্য ও স্বেচ্ছাসিদ্ধি যাচাই করা প্রয়োজন।
যদি বিচার বা তদন্ত করা হয়, সবসময় গুরুত্বপূর্ণ হয় পারিপার্শ্বিক এভিডেন্স ও আলামত। হত্যার ক্ষেত্রে অস্ত্র, গুলির চিহ্ন, আঘাতের চিহ্ন, মৃতদেহ, রক্ত, ডিএনএ, ক্রাইম সিন—এসবকে সূক্ষ্মভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা একজন দক্ষ ইনভেস্টিগেশন অফিসারের কাজ। সঠিকভাবে ডিএনএ টেস্ট ও সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ব্যবহার করলে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
প্রশ্ন থাকে, কেন ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দিয়েই অভিযুক্ত সাজা পায়? যদি অন্যান্য প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়, তা সাজা প্রদানের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু অনেক সময় শর্টকার্টে ইনভেস্টিগেশন শেষ করার জন্য জবানবন্দিকে প্রধান প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। উদাহরণস্বরূপ, রিমান্ডে আসামি জবানবন্দি দিলেন, ম্যাজিস্ট্রেট তা রেকর্ড করলেন, এবং হাইকোর্টে আসামিকে অপরাধী হিসেবে স্থাপন করা হলো—অবশ্যই অন্য পারিপার্শ্বিক এভিডেন্স ছাড়া। এক্ষেত্রে ব্লাডের স্যাম্পল, পিস্তল সংগ্রহ, ব্যালেস্টিক পরীক্ষা বা অন্যান্য অপরাধসংক্রান্ত প্রমাণ উপেক্ষা করা হয়। শুধু ১৬৪ ধারার জবানবন্দি দেখিয়ে আসামিকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়। এটি সংঘাতমুলক ইনভেস্টিগেশন এবং দক্ষতার অভাবের প্রমাণ।
একজন প্রশিক্ষিত ইনভেস্টিগেশন অফিসারের কাজ হলো টেকনিক্যাল কৌশল ব্যবহার করে তথ্য উদঘাটন ও রহস্য উন্মোচন করা। রাষ্ট্র ও জনগণ তাদের জন্য প্রচুর অর্থ ও প্রশিক্ষণ ব্যয় করে। তাই হুমকি, নির্যাতন বা জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায়ের প্রয়োজন নেই। সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত তদন্তই অপরাধের সত্যিকারের প্রমাণ হতে পারে। পদ্ধতিগত ও সঠিক তদন্ত কঠিন, চিন্তাশীল এবং দক্ষতার কাজ। তবে তা এড়িয়ে শর্টকার্ট মেথডে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ওপর নির্ভর করা আইনগত ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। উন্নত রাষ্ট্রগুলিতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এই দেশীয় পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হয় না। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, জবানবন্দি পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট গ্রহণ করলে আইনজীবী, প্রসিকিউটর ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ উপস্থিত থাকেন। এ ক্ষেত্রে অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং রাখা হয়, যাতে পরবর্তীতে আদালত সেটি যাচাই করতে পারে।
ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো অদক্ষতা, অধৈর্য এবং ইনভেস্টিগেশন প্রক্রিয়ায় শর্টকার্ট ব্যবহারের প্রবণতা। ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ওপর নির্ভর করে মামলা শেষ করা আইনের স্পিরিটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন আইন বিশ্লেষকের মতে, যে ইনভেস্টিগেশন অফিসার ১৬৪ ধারা ছাড়া মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেন, তাকে আলাদাভাবে পুরস্কৃত করা উচিত। এছাড়া ইনভেস্টিগেশন অফিসারের জন্য বিসিএস-এ আলাদা ক্যাডার চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে গভীর অধ্যয়ন ও কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ অফিসার বের হয়ে আসেন। তদন্ত প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। আমাদের দেশে তদন্ত সঠিকভাবে না হলে শাস্তির ব্যবস্থা নেই। পুলিশ আইনের মাধ্যমে কিছু ডিপার্টমেন্টাল ব্যবস্থা থাকলেও তা সীমিত এবং নজির কম।
মজার বিষয় হলো, ফৌজদারি কার্যবিধিতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির কপি আসামিকে সরবরাহ না করার কথা কোথাও বলা নেই। তবে চার্জশিট দেওয়ার আগে পুলিশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপি দেয় না। মহামান্য হাইকোর্টে এই বিষয়ে রুল জারি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের ৪ জুলাই নাহিদুল ইসলাম হত্যা মামলায় আসামি লিপন পাটোয়ারী জবানবন্দি প্রদান করেন। তিনি আদালতে কপি চেয়েছিলেন, কিন্তু নিম্ন আদালত নামঞ্জুর করেন। পরে হাইকোর্টে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ ধারা অনুসারে রুল জারি করা হয়, কেন তদন্ত চলাকালীন জবানবন্দির কপি দেওয়া হবে না। সাক্ষ্য আইনের দিক থেকে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি একটি পাবলিক ডকুমেন্ট। আইন অনুযায়ী আসামি এটি পেতে পারেন। তবে বাস্তবে, জবানবন্দির ফটোকপি পাওয়ার জন্য আসামীকে তদন্তকারী কর্মকর্তার দ্বারস্থ হতে হয়, এবং অনেক সময় দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নিতে হয়।
শুধু ১৬৪ ধারার জবানবন্দি নয়, আসামি তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ ভিক্টিমের ২২ ধারার জবানবন্দি এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও পাবলিক ডকুমেন্ট হওয়ায় পাওয়ার অধিকার রাখে। এ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আইনি আলোচনা জরুরি। তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী, “কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার থাকবে এবং নাগরিকের অনুরোধে যথাযথ কর্তৃপক্ষ তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে।” তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চারটি পক্ষ জড়িত—আবেদনকারী, তথ্য সরবরাহের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, আপিল কর্তৃপক্ষ এবং তথ্য কমিশন। অনুচ্ছেদ ৯ (২) অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তথ্য প্রদান করতে হবে।
যদি কর্মকর্তা তথ্য না দেন বা আপিল কর্তৃপক্ষেও আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে তথ্য না পাওয়ার বিষয়ে তথ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ করা যাবে (ধারা ২৪)। তথ্য অধিকার আইনের সেকশন ২৫ (১০) অনুযায়ী, কমিশন ন্যূনতম ৪৫ এবং সর্বোচ্চ ৭৫ দিনের মধ্যে অভিযোগ মীমাংসা করবে। প্রার্থিত সময়ে তথ্য না দিলে কমিশন ধারা ২৭ অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জরিমানা করতে পারে এবং আপিল কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে বিভাগীয় ব্যবস্থা সুপারিশ করতে পারে। সংবাদকর্মী যদি নিজস্ব সোর্স থেকে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করেন, তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী ‘সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধে’ অভিযুক্ত হতে পারেন। এতে ১৪ বছরের জেল এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
তথ্য আইন আপিল অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কোড অব সিভিল প্রসিডিউর প্রযোজ্য। আদালত সমন জারি করতে পারে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কমিশনের সামনে উপস্থিত করতে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ সম্পর্কিত সাক্ষী তলব, অভিযুক্তকে জেরা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার ক্ষমতা রাখে। মজার বিষয় হলো, ফৌজদারি কার্যবিধিতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি আসামিকে সরবরাহ না করার কথা নেই। তবে পুলিশ চার্জশিট দেওয়ার আগে জবানবন্দির অনুলিপি সরবরাহ করে না। মহামান্য হাইকোর্ট ৪ ডি.এল.আর, পৃষ্ঠা ১৩৫ এ এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। তবে তথ্য অধিকার আইনের প্রথম অধ্যায়ের ৩ (খ) অনুযায়ী, তথ্য প্রদানে বাধা সংক্রান্ত বিধানাবলী এই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে, তথ্য অধিকার আইনের বিধান প্রাধান্য পাবে।
সংবাদমাধ্যম খুললেই আমরা দেখতে পাই, “অমুক আসামি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের নামও জানিয়েছে। পুলিশ তাদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।” শুধু তাই নয়, ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে আসামি কি কি বলেছেন, তার বিস্তারিত বিবরণও প্রকাশ করা হয়।
এ ধরনের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সহজ উত্তর দেওয়া হয়, সংবাদকর্মী তার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে গোপনে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী ‘সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধে’ ওই সংবাদকর্মীকে অভিযুক্ত করা যেতে পারে। এতে ১৪ বছরের জেল এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। সূত্র: ‘ল’ ইয়ার্স ক্লাব

