ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, শুধুমাত্র বিক্রয় চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা বা অর্থ ফেরত না দেওয়াকে প্রতারণা হিসেবে ধরা হবে না। ধারা ৪২০ আইপিসি অনুযায়ী প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য দেখাতে হবে যে লেনদেনের শুরু থেকেই অভিযুক্তের প্রতারণামূলক বা অসৎ উদ্দেশ্য ছিল।
বেঞ্চের নেতৃত্ব দেন বিচারপতি বি. ভি. নাগরথ্না এবং সহবিচারপতি আর. মহাদেবন। তারা এই রায় দেন ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের এক আদেশের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের শুনানিতে। ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের আদেশে ধারা ৪৮২ সিআরপিসি অনুযায়ী দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করা হয়েছিল। ওই আবেদনে অভিযুক্ত ব্যক্তি ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিলের অনুরোধ করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের রায় এই প্রমাণের মানদণ্ডকে আরও স্পষ্ট করেছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, শুধুমাত্র অভিযোগ যে কেউ বিক্রয় চুক্তি বাস্তবায়ন করেননি বা অর্থ ফেরত দেননি, তা ধারা ৪২০ আইপিসি অনুযায়ী প্রতারণা প্রমাণ করে না। বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, “কেবল চুক্তি ব্যর্থ হওয়ায় বা অর্থ ফেরত না দেওয়ায় কোনো প্রতারণামূলক প্ররোচনা প্রমাণ হয় না।”
বিচারপতিরা আরও স্পষ্ট করেছেন, চুক্তি করার সময় থেকেই যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণার উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করে, কেবল তখনই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বেঞ্চের মন্তব্য, “এই ধরনের অপরাধমূলক অভিপ্রায় অনুমান করা যায় না। তা অবশ্যই যথাযথ তথ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়।” মামলার শুনানিতে আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী স্রিজা চৌধুরী। প্রতিপক্ষের পক্ষে ছিলেন রাজীব শঙ্কর দ্বিবেদী। এই রায় প্রতারণার প্রমাণের মানদণ্ডকে আরও স্পষ্ট করেছে এবং ব্যবসায়িক চুক্তি সংক্রান্ত মামলার দিক নির্দেশনা দিয়েছে।
মামলার বাদী ছিলেন একজন সম্পত্তির মালিক। ২০১৩ সালে তিনি অভিযোগকারী ব্যক্তির সঙ্গে ৪৩ লক্ষ টাকার বিনিময়ে একটি বিক্রয় চুক্তি করেন। এর মধ্যে অভিযোগকারী ২০ লক্ষ টাকা অগ্রিম প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বিক্রয় দলিল শেষ পর্যন্ত সম্পাদিত হয়নি। আট বছর পর, ২০২১ সালে অভিযোগকারী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ ও এফআইআর দায়ের করেন। অভিযোগে ধারা ৪০৬ (অপরাধজনক আস্থাভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা) এবং ১২০বি (ষড়যন্ত্র) উল্লেখ করা হয়।
এরপর উভয় পক্ষ মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করেন। অভিযুক্ত কিছু অর্থ ফেরত দিতে সম্মত হলেও নির্ধারিত সময়সীমা মেনে না চলায় তাঁর জামিন বাতিল হয়। পরে তিনি হাইকোর্টে মামলাটি বাতিলের আবেদন করেন, কিন্তু তা নাকচ হয়ে যায়। এরপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে আপিল হয়। এই রায় ব্যবসায়িক চুক্তি সংক্রান্ত মামলায় প্রতারণার প্রমাণের মানদণ্ডকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের বিশ্লেষণ:
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে লেনদেনের শুরুতেই অভিযুক্তের প্রতারণামূলক বা অসৎ উদ্দেশ্য থাকা অপরিহার্য। বেঞ্চের মতে, “কোনো ব্যক্তিকে প্রতারণার দায়ে দোষী প্রমাণ করতে হলে এটি দেখাতে হবে যে তিনি প্রতিশ্রুতির সময় থেকেই প্রতারণামূলক বা অসৎ উদ্দেশ্য পোষণ করছিলেন।” আদালত Inder Mohan Goswami বনাম State of Uttaranchal মামলার রায় উদ্ধৃত করেছেন। তবে বর্তমান মামলায় এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রায়ে বলা হয়েছে, “অভিযোগপত্রে কোথাও অভিযুক্তের ইচ্ছাকৃত প্রতারণা বা অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত নেই।”
ধারা ৪০৬ অনুযায়ী অপরাধও প্রমাণিত হয়নি:
বেঞ্চ উল্লেখ করেছে, অপরাধজনক আস্থাভঙ্গের জন্য ধারা ৪০৬ অনুযায়ী ‘সম্পত্তি হস্তান্তর’ ও ‘অসৎভাবে আত্মসাৎ’ প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু অভিযোগকারীর পক্ষে এ দুটি উপাদান আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। বিচারপতিরা ব্যাখ্যা করেছেন, “প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গ একে অপরের বিপরীত প্রকৃতির অপরাধ। প্রতারণায় অপরাধমূলক উদ্দেশ্য থাকে শুরু থেকেই, আর আস্থাভঙ্গে অপরাধ ঘটে সম্পত্তি হাতে পাওয়ার পর তা অসৎভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে। একে একই ঘটনায় একসাথে ধরা সম্ভব নয়।”
সুপ্রিম কোর্ট রায়ে উল্লেখ করেছে, চুক্তির আট বছর পর মামলা দায়ের করা অভিযোগকারীর সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আদালত বলেন, অভিযোগকারী দেওয়ানি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন, যা “ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য” নির্দেশ করতে পারে। বেঞ্চ সতর্ক করে বলেছেন, “ফৌজদারি আইনকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা বিরোধ নিষ্পত্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।”
আদালত State of Haryana v. Bhajan Lal মামলার রায় উল্লেখ করে বলেছে, বর্তমান মামলা সেই ধরনের যেখানে অভিযোগগুলো স্পষ্টভাবে ‘মালাফাইড’ বা অবিশ্বাস্য। এছাড়া Vishal Noble Singh v. State of Uttar Pradesh (2024) মামলার রায়ও উদ্ধৃত করে আদালত সতর্ক করেছে যে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে অপব্যবহার থেকে রক্ষা করতে আদালতকে সচেতন থাকতে হবে।
রায়ের ফলাফল: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের আদেশ বাতিল করে অভিযুক্তের পক্ষে রায় দিয়েছেন। আদালত স্পষ্ট করেছেন, ধারা ৪০৬, ৪২০ ও ১২০বি অনুযায়ী কোনো প্রাথমিক অপরাধের উপাদান প্রমাণিত হয়নি। ফলে আদালত অভিযোগ, এফআইআর এবং পুরো ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করে দিয়েছেন। এই রায় প্রতারণা এবং আস্থাভঙ্গের মানদণ্ডকে আরও স্পষ্ট করেছে এবং ফৌজদারি মামলা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে।

