২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যায়। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান মূলত ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এই আন্দোলন দেশের মানুষকে দেখিয়েছে, একটি সমাজে স্বাধীন বিচার বিভাগের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। সেই সঙ্গে জনগণের মনে বিচার বিভাগ সংস্কারের তীব্র দাবি জাগে।
শেখ হাসিনার পতনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াডাম কলেজ থেকে ‘আজীবন সম্মাননা ফেলোশিপ’প্রাপ্ত এই বিচারপতি এমন একটি সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন যখন বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ছিল উচ্চ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন ছিল সময়ের দাবী।
এমন প্রেক্ষাপটে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে ২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। এই রোডম্যাপে প্রস্তাব করা হয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কমানো, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন, কলেজিয়াম পদ্ধতিতে বিচারপতি নিয়োগসহ একাধিক সংস্কার। এর পাশাপাশি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আপিল বিভাগের সাবেক একজন বিচারপতিকে প্রধান করে ‘বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন’ গঠন করে। এই কমিশনও বিভিন্ন সুপারিশ প্রদান করে বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র করার লক্ষ্যে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধান বিচারপতির ঘোষিত রোডম্যাপ ও সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিচার বিভাগ সংস্কারে রোডম্যাপ বাস্তবায়নে প্রধান বিচারপতি দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে গেছেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ইতোমধ্যেই অনেক পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট বিচার বিভাগ স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু করেছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’ প্রতিষ্ঠাসহ কয়েকটি বড় উদ্যোগ বাস্তবায়নের দোরগোড়ায় রয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগের পুরোপুরি স্বাধীনতার পথে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ ও বাধা রয়ে গেছে। এসব পার করতে পারলে বাংলাদেশে স্বাধীন, শক্তিশালী এবং নতুন ধারার ‘ভাইব্রেন্ট’ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি যে রোডম্যাপ দিয়েছিলেন, তা অধিকাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা দুটি নতুন বিধিমালা পেয়েছি। অধস্তন আদালতের জন্য সার্ভিস রুলস বিধিমালা চালু হয়েছে। ২৩২টি পদ সৃজন করা হয়েছে। এটি বিচার বিভাগ সংস্কারে বড় অগ্রগতি। সিভিল ও ক্রিমিনাল কোর্ট আলাদা করা হয়েছে। এছাড়া আমরা আলাদা বাণিজ্যিক আদালত পেতে যাচ্ছি। অধস্তন আদালতের পদ সৃজনের ক্ষমতা স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আমি মনে করি, একটি জনবান্ধব ও স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা কেবল সময়ের ব্যাপার।’
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট তানিম হোসাইন শাওন বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট ও সংস্কার কমিশনের খসড়া সমন্বয় করে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের আইন প্রণীত হয়েছে। এই আইনের আওতায় ইতোমধ্যেই উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ শুরু হয়েছে। এটি একটি বড় সফলতা। সংস্কার কমিশনের অন্যান্য সুপারিশের বাস্তবায়নও চলছে। যেমন- সুপ্রিম কোর্ট সেক্রেটারিয়েট আইন। আমরা আশা করি, সরকার এটিও শিগগিরই বাস্তবায়ন করবে। এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি ও দেওয়ানি কার্যবিধিতে কিছু সংশোধন আনা হয়েছে। লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মেডিয়েশন প্রমোট করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই ১২ জেলায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তবে কিছু সুপারিশ এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি। যেমন- অ্যাটর্নি সার্ভিস আইন। এর খসড়া তৈরি হয়েছে এবং এক দফা মতবিনিময় হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত এই আইন নিয়েও কাজ শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, ‘এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ হবে।’
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত:
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার এক সময় বিচার বিভাগকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংসদের হাতে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ন্যস্ত করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করেছিল। যদিও হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ এই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছিল, সরকারের অসহযোগিতার কারণে মামলাটি দীর্ঘদিন স্থগিত থাকেছিল। ফলে বিচারপতি অপসারণের কোনো কার্যকর ফোরাম ছিল না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করেন। এর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনরুজ্জীবিত হয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই কাউন্সিলে থাকছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।
নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ দুইজন বিচারপতি নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে, কাউন্সিল রাষ্ট্রপতির কাছে অপসারণ বা অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ পাঠায়। রাষ্ট্রপতি পরবর্তীতে সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন। ইতোমধ্যেই এই কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে একাধিক বিচারপতি অপসারিত হয়েছেন।

সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও স্বতন্ত্রতা:
প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ অনুযায়ী সরকার সুপ্রিম কোর্টের ‘বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে। ২১ জানুয়ারি জারি হওয়া এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে এখন থেকে স্বতন্ত্র কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হবে। উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগে দলীয়করণমুক্তি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
অধ্যাদেশে সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এ কাউন্সিলে থাকবেন— আপিল বিভাগের দুজন বিচারক (একজন অবসরপ্রাপ্ত ও একজন কর্মরত), হাইকোর্টের দুজন বিচারক, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং প্রধান বিচারপতি মনোনীত একজন আইন বিশেষজ্ঞ বা আইনের অধ্যাপক।

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানান, কাউন্সিল নিজ উদ্যোগে প্রার্থী তালিকা তৈরি করবে। আইনজীবীসহ যে কেউ নিজের নাম প্রস্তাব বা আবেদন করতে পারবে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে কাউন্সিল সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবে এবং যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেবে। ইতোমধ্যে প্রধান বিচারপতি বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল গঠন করেছেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে আপিল বিভাগে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবকে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। ২৫ আগস্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিলের সুপারিশে হাইকোর্টে ২৫ জন বিচারপতি নিয়োগ পাওয়া গেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘বিতর্কমুক্ত’ নিয়োগ বলছেন।
দ্বারপ্রান্তে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মাইলফলক:
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ ও সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিচার বিভাগ সংস্কারে সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে—পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠনের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম পূর্ণতা পাবে। ইতোমধ্যে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে আইন মন্ত্রণালয় ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া তৈরি করেছে। খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।’
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করাটা বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশনের একটি সুপারিশ ছিল। প্রধান বিচারপতির সংস্কার ভাবনায়ও এটি অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে আমরা অনেক কাজ করেছি। আমার ধারণা, এ সরকারের আমলেই সচিবালয় গঠন সম্ভব হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা হলে এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। উল্লেখ্য, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। আলাদা সচিবালয় গঠিত হলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও ছুটিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ দূর হবে এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে।
অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি-পদায়ন নীতিমালা:
অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির জন্য আগে কোনো নীতিমালা ছিল না। প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ অনুসারে, গত বছরের ৩ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই নীতিমালার খসড়া প্রকাশ করে। সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকদের বদলি ও পদায়নে অভিন্নতা বজায় রাখা এবং দক্ষ বিচার প্রশাসন গঠন করা লক্ষ্য ছিল। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের দিকনির্দেশনায় হাইকোর্ট বিভাগ খসড়াটি প্রণয়ন করেছে।
খসড়া অনুযায়ী, কোনো বিচারককে এমন কোনো কর্মস্থলে বদলি করা যাবে না যেখানে তার স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোন, পিতামহ বা মাতামহ আইন পেশায় নিযুক্ত রয়েছেন। সহকারী জজ হিসেবে যোগদানের আগে যদি কোনো আইনজীবী সমিতিতে দুই বছর আইনচর্চা করে থাকে, তবে চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী ১০ বছর তাকে উক্ত জেলায় পদায়ন করা যাবে না।
কৃষি বা অকৃষি ভূমির মালিকানা থাকলে সেই জেলায় পদায়ন হবে না। এছাড়া, বিচারকদের কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করা যাবে না। তবে বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকলে বা বদলির কারণে বিচার প্রশাসনে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে—এমন ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির অনুমতিতে আরও এক বছর একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকবে। চৌকি আদালতে কর্মরত বিচারকের পদায়নের মেয়াদকাল হবে সর্বোচ্চ এক বছর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নীতিমালাটি দ্রুত গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে:
গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট একটি রায় দিয়ে অধস্তন আদালতের দায়িত্বপালনরত বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি অনুমোদন এবং শৃঙ্খলা বিধানের সব দায়িত্ব। রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল ১১৬ অনুচ্ছেদ বহাল রাখা হয়েছে। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়টি দেন।
রায়ে সুপ্রিম কোর্টকে তিন মাসের মধ্যে একটি পৃথক সচিবালয় গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারকদের জন্য ২০১৭ সালে তৈরি করা শৃঙ্খলাবিধিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হয়েছে। এ রায়ের মাধ্যমে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আর সুপ্রিম কোর্টে অনুমোদন বা ধরণের প্রয়োজন হবে না। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় যে বাধা ছিল, তা দূর হয়ে গেছে। এখন থেকে বিচারকদের বদলি ও শৃঙ্খলা বিধান সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে আর কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
দেশে প্রথমবার পৃথক দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত, মামলা নিষ্পত্তিতে গতি বৃদ্ধি:
প্রধান বিচারপতির নির্দেশে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল আইন মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র পাঠিয়ে ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিচারিক কার্যক্রম আলাদা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগের কাঠামোতে পরিবর্তন আনা এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক পদ সৃষ্টি করার সুপারিশ করা হয়। এর ফলস্বরূপ, ১৮ সেপ্টেম্বর দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত সম্পূর্ণভাবে পৃথক করা হয়। এতে মামলা পরিচালনার সময় বাঁচবে এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যুগান্তকারী এই সিদ্ধান্ত জেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করবে। এর ফলে উভয় আদালতে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ ও গতি আগের চেয়ে বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। বিদ্যমান মামলাজটও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিচার বিভাগে ২৩২ নতুন পদ সৃষ্টি:
বিচার বিভাগ সংস্কারের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন আদালতে ২৩২টি নতুন বিচারকের পদ সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নির্দেশে এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, ২০২৫–এর বিধি ৫ অনুসারে গঠিত কমিটি সুপ্রিম কোর্টে সভা করে পদ সৃষ্টির বিষয়টি চূড়ান্ত করে।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের জন্য জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদায় ৬৪ জেলায় ৬৪টি এবং মহানগর এলাকায় আরও ৮টি পদসহ মোট ৭২টি পদ সৃষ্টি করা হবে। পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান ছাড়া বাকি ৬১টি জেলায় জেলা জজ পদমর্যাদার পারিবারিক আপিল আদালতের জন্য ৬১টি পদ এবং ঢাকা জেলায় মামলার সংখ্যা অনুযায়ী অতিরিক্ত ৪টি পদসহ মোট ৬৫টি পদ তৈরি হবে। এছাড়া, বিদ্যমান ৫৪টি ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের জন্য জেলা জজ পদমর্যাদার ৫৪টি ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের জন্য আগে সৃজিত যুগ্ম জেলা জজ পদমর্যাদার ১৩টি বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৪১টি পদ সৃষ্টি করা হবে। সবমিলিয়ে ২৩২টি নতুন বিচারিক পদ তৈরি করা হবে।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, নতুন পদগুলোর বিপরীতে সহায়ক জনবল নিয়োগ, অফিস সরঞ্জাম নির্ধারণ এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগে পাঠানোসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনের জন্য আইন ও বিচার বিভাগ উদ্যোগ নেবে। প্রধান বিচারপতির অনুমোদনক্রমে এসব পদ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতা আনতে ১২ দফা নির্দেশনা:
প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছেন। এই নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন তদারকির জন্য সুপ্রিম কোর্টে প্রতি মাসে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে সভাপতিত্ব করছেন প্রধান বিচারপতি নিজে। জেলা পর্যায়ের আদালতেও এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে বিচার বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়েছে।
পেপারলেস হাইকোর্ট বেঞ্চ:
প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে বিচার সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট কোম্পানি বেঞ্চে সম্পূর্ণ কাগজবিহীন (পেপারলেস) বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এই উদ্যোগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। পরে ২০ জুলাই আরেকটি কোম্পানি বেঞ্চেও কাগজবিহীন বিচার কার্যক্রম চালু হয়। প্রধান বিচারপতির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে অন্যান্য বেঞ্চেও এই পদ্ধতি সম্প্রসারণ করা হবে।
সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশে হেল্পলাইন চালু:
২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে সেবাগ্রহীতাদের জন্য একটি হেল্পলাইন চালু করা হয়। পরে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় হেল্পলাইন চালু হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ১৪ মে দেশের ৬৪ জেলা ও আট মেট্রোপলিটন এলাকায় নাগরিকদের জন্য হেল্পলাইন চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিটি জেলায় তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং জেলা ও দায়রা জজকে সিমসহ মোবাইল ফোন সরবরাহ করা হয়েছে।
বিদেশি কূটনীতিকদের আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশি বিচার বিভাগ:
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে আস্থার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ব্রিটিশ স্টাইলে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলার মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান, মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেছেন। বিদেশি কূটনীতিকরা প্রধান বিচারপতির রোডম্যাপ ও সংস্কার কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন এবং বাংলাদেশে স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে বাংলাদেশ:
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ যখন দায়িত্ব নেন, তখন তিনি বিচার বিভাগ সংস্কারের জন্য রোডম্যাপ ঘোষণা করেছিলেন। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় তার অনেক উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে মূল বিষয়টি হলো সুপ্রিম কোর্টকে মন্ত্রণালয় থেকে মুক্ত করা। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এটিকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। হাইকোর্ট ইতোমধ্যে সেই বিধান বাতিল করেছে। তাই সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার পথে আর কোনো বাধা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বললেও কার্যকরভাবে নির্বাহী বিভাগের সহযোগিতা সবসময় পাওয়া যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, প্রধান বিচারপতি যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তা তারা সমর্থন করবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় করা হয়নি। এটি এখনো সবচেয়ে বড় বাধা। নির্বাহী বিভাগের সদিচ্ছা প্রয়োজন। আমরা চাই সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারুক। বর্তমান প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ এ বিষয়ে অত্যন্ত সক্রিয়।’
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তানিম হোসাইন শাওন বলেন, ‘বিচারপতি নিয়োগে যে আইন হয়েছে, তার মাধ্যমে দলীয়করণ অনেক কমে যাবে। তবে পুরোপুরি চলে যাবে না। পৃথিবীর কোথাও একেবারে রাজনৈতিক বিবেচনা শূন্য হয় না। সব জায়গায় কিছু না কিছু বিবেচনা থাকে। তবে সেটাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা সম্ভব।
‘আমরা আবেদনকারীদের থেকে যত তথ্য ও দলিল চেয়েছি, তা যদি তারা জমা দেন এবং নির্ধারিত ইন্টারভিউ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন, তাহলে যোগ্যতার ভিত্তিতে যাচাই করা সম্ভব। রাজনৈতিক পরিচয় মানেই যে তিনি বিচারক হওয়ার অযোগ্য, তা নয়। প্রধান বিচারপতির নিয়োগে আমাদের সুপারিশ, আপিল বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র বিচারপতি হবেন। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।’
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠায় আমাদের প্রচেষ্টা চলছে। সেপারেট জুডিশিয়াল সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠা এবং ১১৬ অনুচ্ছেদের ওপর হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন হলে এটি কার্যকর হবে। অধস্তন আদালতের ওপর সুপ্রিম কোর্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পাবে। এতে বাংলাদেশ নতুন একটি গতিধারায় প্রবেশ করবে। এছাড়া কমার্শিয়াল আদালত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ভেরি ইনোভেটিভ। এটা অবশ্যই সফল হতে হবে।’
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা:
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং একটি শক্তিশালী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘পৃথক সচিবালয় এখনও পাইনি। এটি হলে বিচার বিভাগের কাজে গতি আসবে এবং আমাদের চাহিদাগুলো সরকারকে আরও দৃঢ়ভাবে জানাতে পারব। এখন আমরা দ্বৈত শাসনের মধ্যে আছি। আশা করি, দ্রুতই এর অবসান ঘটবে। এছাড়া আদালতে সহায়ক স্টাফ ও অবকাঠামোগত কিছু অসুবিধা রয়েছে। এগুলো সমাধান হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পূর্ণতা পাবে।’
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘ই-জুডিশিয়ারি সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। আরও অধিক সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া যেত এবং আপিল বিভাগকে বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে আলাদা করা যেত। উদাহরণস্বরূপ, ক্রিমিনাল ও সিভিল এক বেঞ্চে এবং রিট ও কোম্পানি অন্য বেঞ্চে। এসব প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে আরও গ্রহণযোগ্য বিচার বিভাগ গড়ে তোলা যেত। এছাড়া প্রশাসনিক দক্ষতাকে ই-জুডিশিয়ারি মেকানিজমের সঙ্গে যুক্ত করলে বিচার বিভাগ আরও ভাইব্রেন্ট হবে।’
সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তানিম হোসাইন শাওন বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আরও কিছু সংস্কার নিজ উদ্যোগে নিতে পারত। যেমন- মামলা ব্যবস্থাপনা। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম, আদালতের সময়কে বেশি কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। যেমন, মেনশন আওয়ারের সময় কমানো এবং অনলাইন মেনশন স্লিপ চালু করা। এছাড়া আদালতের আদেশ সঙ্গে সঙ্গে কজলিস্টে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। আপিল বিভাগে এটি ইতোমধ্যেই আছে, কিন্তু হাইকোর্টের সব বেঞ্চে এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। সব জাজমেন্ট অনলাইনে প্রকাশিত হলে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা আরও নিশ্চিত হবে।’
স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ ও বাধা:
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের পথে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা যে সংস্কারগুলো করেছি, তার সুফল এখনই পাব না। সময় লাগবে। আমরা আইন প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করে যাচ্ছি, কিন্তু পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার যদি এগুলো আন্তরিকভাবে এগিয়ে না নিয়ে যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘বিচার বিভাগের পুরোপুরি স্বাধীনতার পথে বড় বাধা হলো নির্বাহী বিভাগের অসহযোগিতা। মন্ত্রণালয় মুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় এখনও গঠিত হয়নি। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এতটুকুই পাওয়া গেছে না। এখানে নির্বাহী বিভাগের সদিচ্ছা অপরিহার্য। আমরা চাই সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্বতন্ত্র সচিবালয় স্থাপন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসা উচিত।’
সংস্কার কমিশনের সদস্য অ্যাডভোকেট তানিম হোসাইন শাওন বলেন, ‘সময়ের সীমাবদ্ধতা একটি চ্যালেঞ্জ। নির্বাচন ফেব্রুয়ারি মাসে, সেক্ষেত্রে নভেম্বরের পর আইন প্রণয়নের সুযোগ কমে যাবে। আরেকটি সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব। কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যদি আমাদের সঙ্গে বসত, তাহলে সংস্কার উদ্যোগগুলো দ্রুত ও সহজে বাস্তবায়ন হতো।’
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘স্বাধীনভাবে যারা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চান, তাদের ওপরও আস্থা নেই। মানসিক বাধা আছে—কোনো বিচারক কি আমার বা আমার লোকের পক্ষ নেওয়া হবে না, তা নিয়ে উদ্বেগ। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হলো যোগ্য, সৎ ও অভিজ্ঞ বিচারক। যার পক্ষেই হোক, তা বড় বিষয় নয়। দেখার বিষয় হলো এটি দেশের ও মানুষের পক্ষে গেছে কি না। এই মানসিকতার পরিবর্তন একটি চ্যালেঞ্জ। আগামী নির্বাচনের যে দলই ক্ষমতায় আসুক, এটি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। বিচারক যেন শপথ অনুযায়ী কাজ করতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, ‘বিচার বিভাগে সংস্কার হলেও সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাজনৈতিক প্রভাব। বিচারকরা যদি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য দেখান বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের স্বচ্ছ বিচারপ্রাপ্তিতে বড় বাধা তৈরি হয়। অতীত দেখায়, দেশে যেকোনো সরকারই চাইনি বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক। তারা নিজেদের পছন্দের বিচারক নিয়োগ করেছেন। রাজনীতিবিদদের হস্তক্ষেপ থাকলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যায়।

