যশোরের সাজিয়া আনজুম মিতুর পরিবার এক কঠিন পারিবারিক বিরোধে পড়েছে। তাঁর বাবা তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজো। তিন ভাইয়ের নামে থাকা পৈতৃক সম্পত্তি আইন অনুযায়ী ভাগ হলেও বড় চাচা সেই ভাগ মানছেন না। বাবার প্রাপ্য অংশ দিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। বরং সম্পত্তি বঞ্চনার লক্ষ্যে একের পর এক মিথ্যা মামলা করে যাচ্ছেন।
আইন অনুযায়ী পৈতৃক বাড়ির ভাগ মিতুদের পক্ষে গেলেও বড় চাচা তা মেনে নেননি। মামলায় জয়ের পরও তিনি নতুন করে হয়রানি শুরু করেছেন। এবার তিনি ফৌজদারি মামলার পথে হেটেছেন। এতে সম্মানজনক পেশায় থাকা মিতুর বাবা-মা নিয়মিত থানায় দৌড়াদৌড়ি করছেন। এতে তাঁদের মানহানি ও মানসিক চাপ বাড়ছে।
এ অবস্থায় পরিবারটি বড় চাচার অব্যাহত জুলুম ও মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিলে কার্যকর প্রতিকার মিলবে তা জানতে চায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক বিরোধ মামলা-মোকদ্দমায় রূপ নিলে তা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানসিক ও সামাজিক চাপে ফেলে। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী পরিবার কিছু আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে
মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা:
মিথ্যা মামলায় হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা চেয়ে অনেক পরিবারই বিভিন্ন দাপ্তরিক ও বিচারিক পর্যায়ে ঘুরে বেড়ান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ভিত্তিহীন মামলা বা উদ্দেশ্যমূলক হয়রানির বিরুদ্ধে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতিনিয়ত বিরোধ সৃষ্টি, ভয়ভীতি দেখানো বা মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কয়েকটি ধাপে প্রতিকার চাইতে পারেন।
দণ্ডবিধির ২১১ ধারা:
কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা মামলা করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় ফৌজদারি অভিযোগ আনতে পারেন ভুক্তভোগী। আদালত প্রমাণ পেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডই দিতে পারেন। আইনজীবীরা বলেন, এই ধারা প্রয়োগে আদালত বিবেচনা করেন—অভিযুক্ত ব্যক্তি কি সত্যিই ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মামলা করেছিলেন কি না।
শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধে ১০৭/১০৬ ধারা:
ঘনঘন ঝগড়া, ভয়ভীতি, হয়রানি বা অশান্তি সৃষ্টি করলে থানা বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১০৭ ধারায় আবেদন করা যায়। এতে অভিযুক্তকে বন্ডে বাধ্য করা হয়। এর লক্ষ্য ভবিষ্যতে কোনো অশান্তি বা বেআইনি কর্মকাণ্ড থেকে তাঁকে বিরত রাখা। প্রয়োজনে আদালত ১০৬ ধারায় অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করতে পারেন।
মানহানির মামলা করার সুযোগ:
মিথ্যা অভিযোগের কারণে যদি কারও সামাজিক অবস্থান বা পেশাগত সম্মান ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে সিভিল বা ফৌজদারি ডিফামেশন মামলা করা যায়। এতে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার সুযোগও থাকে। আইনজীবীরা বলেন, ভিত্তিহীন অভিযোগে মানহানি হলে এই পথ কার্যকর প্রতিকার হতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য, মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও সঠিক আইনি পদক্ষেপ নিলে হয়রানি কমে এবং প্রতিপক্ষের অপব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব।
সম্পত্তিসংক্রান্ত স্থায়ী সমাধান:
পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে মামলায় জয় পেয়েও বাস্তবিক ভোগদখলে যেতে পারছেন না—এ অভিযোগ অনেক ভুক্তভোগীরই। সাজিয়া আনজুম মিতুর পরিবারও এমন অবস্থায় পড়েছে। আদালতের রায় তাঁদের পক্ষে এলেও বড় চাচা তা মানতে নারাজ। ফলে রায় কার্যকর না হওয়ায় পরিবারটি নতুন হয়রানিতে পড়ছে। আইনজীবীদের মতে, রায় পাওয়ার পরও প্রতিপক্ষ মানতে না চাইলে আদালতের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে।
ডিক্রি কার্যকর করার আবেদন:
যে আদালত রায় দিয়েছেন, তাঁর কাছেই ‘রায় বাস্তবায়ন মামলা’ করা যায়। এতে আদালত সরাসরি মাঠ জরিপ, পরিমাপ বা বিভাজনের নির্দেশ দিতে পারেন। প্রয়োজনে আদালত স্থানীয় প্রশাসন বা জরিপ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে পৈতৃক সম্পত্তির অংশ চূড়ান্তভাবে বুঝিয়ে দেন। এ ক্ষেত্রে কারও বাধা, অস্বীকৃতি বা জবরদস্তি রায়ের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।
পুলিশ প্রোটেকশন চাওয়া: জমি বুঝে নেওয়ার সময় বাধা সৃষ্টি হলে আদালতের নির্দেশে পুলিশ সহায়তা দিতে বাধ্য। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ অনুযায়ী পুলিশ现场ে গিয়ে নিরাপত্তা দেয়, যাতে সম্পত্তি বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়া বাধাহীনভাবে সম্পন্ন হয়।
হয়রানি বন্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ: আইনজীবীরা বলছেন, আইনের পাশাপাশি প্রশাসনিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ।
থানায় জিডি করা: ধারাবাহিক হুমকি, ভয়ভীতি, মিথ্যা অভিযোগ বা হয়রানির বিস্তারিত উল্লেখ করে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করলে তা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে আসে। পুলিশের পক্ষ থেকেও সতর্কতামূলক সহায়তা পাওয়া যায়।
মানবাধিকার কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা: নিরবচ্ছিন্ন হয়রানির কারণে পরিবারের মানসিক ও সামাজিক চাপ বেড়ে গেলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জেলা প্রশাসন বা আইন সহায়তা দপ্তরের কাছে অভিযোগ করা যায়। এসব সংস্থা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, আদালতের রায় হাতে থাকলে নির্দ্বিধায় তার বাস্তবায়ন চান। পাশাপাশি মিথ্যা মামলা ও হয়রানির বিরুদ্ধে নিয়মিত নথিপত্র সংরক্ষণ করলে প্রতিকার পেতে সুবিধা হয়।
নারী-শিশু সেল:
ধারাবাহিক মিথ্যা মামলা ও হয়রানিতে পরিবারে যদি সামাজিক বা মানসিক চাপ চরমে পৌঁছায়, বিশেষজ্ঞরা প্রশাসনিক সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা সেলের কাছে অভিযোগ করলে তাঁরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
পরিবারকে মানসিক ও সামাজিকভাবে সুরক্ষায় করণীয়:
আইনজীবীরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক বিরোধে পরিবারের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও সমান জরুরি। সব আইনি নথিপত্র—রায়ের কপি, জিডি, নোটিশ ও অন্যান্য কাগজপত্র—সঠিকভাবে সাজিয়ে সংরক্ষণ করা উচিত। প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের সামনে কোনো বিতর্ক বা ঝগড়ায় না জড়ানোর পরামর্শ দেন তাঁরা। কারণ এসব পরিস্থিতিকে প্রতিপক্ষ আবারও মামলা বানানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। প্রতিটি পদক্ষেপই আইনজীবীর পরামর্শে নেওয়া উচিত।
দক্ষ আইনজীবীর সহায়তা অপরিহার্য:
দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় পাল্টা ফৌজদারি মামলা, শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধে ১০৭/১০৬ ধারায় আবেদন, মানহানির মামলা বা রায় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া—এসব পদক্ষেপ অভিজ্ঞ আইনজীবীর দিকনির্দেশনা ছাড়া এগোনো কঠিন। নিয়মিত যোগাযোগে থাকলে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত ও সঠিকভাবে এগোয়। আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মিথ্যা মামলা ঠেকাতে পাল্টা মামলা, শান্তিভঙ্গ প্রতিরোধ, মানহানি মামলা এবং ডিক্রি কার্যকর এই চার পদক্ষেপ নিলে হয়রানি অনেকটাই কমে আসে। প্রয়োজনে প্রতিপক্ষ আইনি শাস্তির মুখেও পড়তে পারে।
ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। সূত্র: আজকের পত্রিকা

