একটি জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে এই দুই সংস্থার সমন্বয়ে গঠন করা হয় জেলা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কমিটি কিন্তু কমিটি থাকলেও কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
সমন্বয়ের ঘাটতি প্রধানত তথ্য সরবরাহে জটিলতার কারণে। পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপারকে তার পুলিশ সুপারের মাধ্যমে এফআইআর ও জিডির ভিত্তিতে বিপি ফরম-১৬ পূরণ করে প্রতিদিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জমা দিতে হয় কিন্তু বাস্তবে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে শুধুমাত্র সাপ্তাহিক গোপনীয় প্রতিবেদন এবং পাক্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের অনুলিপি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর দাবি করেছে, জেলা প্রশাসকের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন অভিযান ও কার্যক্রমে তারা সহায়তা প্রদান করে। তবে জেলা প্রশাসনের কাছে নিয়মিত তথ্য না পাঠানোর বিষয়টি পুলিশের একজন কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন। পুলিশের পক্ষের বক্তব্য, জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা প্রশাসনের ভূমিকা সীমিত। এজন্য সাত বা পনের দিন পরপর তথ্য প্রেরণই যথেষ্ট। এই মনোভাব দুইটি বিষয় নির্দেশ করছে। একদিকে তারা নিজেদের প্রবিধান মেনে চলছে না। অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যকর ভূমিকাকে অপর্যাপ্ত দেখানো হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকে। জেলার ওপর নজরদারিতে এ প্রশাসনকেই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হয়। তারা যেকোনো অপরাধ দমনে তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তারা স্থানীয় জনগণকে অপরাধ দমনে সম্পৃক্ত করতে পারে। কারণ স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো অঞ্চলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম খুব বেশি ফলপ্রসূ হয় না। এছাড়া জেলা প্রশাসন জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু পুলিশের বর্তমান মনোভাব পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের অবশ্যই তাদের নিজস্ব প্রবিধান মেনে চলা জরুরি।
প্রতিদিন সংঘটিত আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক তথ্য এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন পর প্রাপ্ত হলে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো তথ্য না পাওয়ার কারণে প্রকৃত ঘটনা যথাসময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কয়েক দফা তাগাদা দিয়েছে, যাতে প্রতিদিন এফআইআর ও জিডির তথ্য জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু পুলিশ এখনও নিয়মিত সাড়া দিচ্ছে না।
আইনের প্রয়োগকারীরা নিজ দায়িত্বে আইন মানছেন না, বিষয়টি হতাশাজনক। তথ্য সরবরাহের এই জটিলতা অব্যাহত থাকলে জননিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে সামনে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে সমন্বিতভাবে অপরাধ দমনে সক্রিয় থাকতে হবে। নির্বাচন ঘিরে যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে এটি আবশ্যক। পুলিশের ইতিবাচক ভাবমূর্তির জন্যও এ সমন্বয় জরুরি। গত দেড় দশকে পুলিশের ভূমিকা নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়েও এই ভাবমূর্তির প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পুলিশ কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি দেশের আইন-শৃঙ্খলা আরও নাজুক হয়ে ওঠে, সেটিও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সবার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে। অতীত ভূমিকার পর্যালোচনায় এটি সবচেয়ে বেশি পুলিশকেই ভাবমূর্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই পুলিশকে অবশ্যই সমন্বয়হীনতা দূর করতে মনোনিবেশ করতে হবে। আইন না মানা বা সমন্বয়ের ঘাটতি যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব। অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কাছে নিয়মিত প্রয়োজনীয় তথ্য প্রেরণ করা জরুরি। যদি পুলিশ সাড়া না দেয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমীচীন হবে।
একটি জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব সেই জেলার সমন্বয় কমিটির। কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসক। জেলার সব ধরনের অপরাধের হালনাগাদ তথ্য জেলা প্রশাসকের কাছে থাকা আবশ্যক। তা না হলে নাগরিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ধরপাকড়, অবৈধ অর্থ আদায় ও নাগরিকদের ওপর নিপীড়নের সুযোগ তৈরি হয়। নিয়মিত তথ্য সরবরাহ থাকলে এসব ঘটনার সম্ভাবনা কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এতে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দেশের বহু জেলায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ, বিশেষ করে ডিসি ও এসপির মধ্যে এক ধরনের বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষমতার সীমা, কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্তের অগ্রাধিকার নিয়ে অযাচিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এতে কাজের ব্যাঘাত ঘটে, কিন্তু কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় না। এমনকি কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এসপিরা জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে নিজস্ব প্রতিনিধি পাঠাচ্ছেন, যদিও নিয়ম অনুযায়ী তাদের সরাসরি উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। এ ধরনের নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড মোটেও কাম্য নয়। একটি জেলার নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ ভূমিকা অপরিহার্য। দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ব অবহেলার কারণে জননিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়লে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

