পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় নতুন শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২৫ জারি করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, কেউ হর্ন আমদানি, উৎপাদন, 3মজুত বা বিক্রি করলে শাস্তির মুখোমুখি হবে।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো যানবাহন অযথা হর্ন বাজালে বা শব্দদূষণ করলে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) ঘটনাস্থলেই চালককে থামিয়ে জরিমানা আদায় করতে পারবেন। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় এই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ২০০৬ সালের পুরনো বিধিমালা বাতিল করে নতুন করে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম প্রণয়ন করা হয়েছে। বিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে এলাকা ভিত্তিক নতুন বিধিমালা:
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী দিনে ও রাতে এলাকাভিত্তিক শব্দের সীমা নির্ধারণ করেছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ‘দিবাকালীন’, রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ‘রাত্রিকালীন’ ধরা হবে। এলাকা অনুযায়ী শব্দের সীমা নির্ধারিত হয়েছে:
- নীরব এলাকা: দিনে ৫০ ডেসিবল, রাতে ৪০ ডেসিবল
- আবাসিক এলাকা: দিনে ৫৫, রাতে ৪৫ ডেসিবল
- মিশ্র এলাকা: দিনে ৬০, রাতে ৫০ ডেসিবল
- বাণিজ্যিক এলাকা: দিনে ৭০, রাতে ৬০ ডেসিবল
- শিল্প এলাকা: দিনে ৭৫, রাতে ৭০ ডেসিবল
সরকার অযথা হর্ন বাজানো বন্ধে পদক্ষেপ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। তাই নতুন বিধিমালায় হর্নের আমদানি, উৎপাদন, মজুত, বিক্রি, প্রদর্শন, বিতরণ ও বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অননুমোদিত হর্ন কোনো যানবাহন বা নৌযানে স্থাপন ও ব্যবহার করা যাবে না। নীরব ও আবাসিক এলাকায় সীমাবদ্ধতা:
- নীরব এলাকায় কোনো যানবাহনের হর্ন বাজানো যাবে না।
- আবাসিক এলাকায় রাত ৯টার পর থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ।
- নীরব এলাকায় দিনে ও রাতে, অন্যান্য এলাকায় রাতে পটকা, আতশবাজি বা অনুরূপ শব্দ সৃষ্টিকারী বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ। তবে রাষ্ট্রীয়, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা উৎসবে অনুমতি নিয়ে সীমিত ব্যবহার করা যাবে।
শিল্পকারখানাকে শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। আবাসিক, বাণিজ্যিক, মিশ্র, শিল্প ও নীরব এলাকার জেনারেটর ব্যবহারকারীকে জেনারেটর থেকে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে বিধিনিষেধ:
- বনভোজন নিষিদ্ধ।
- উচ্চ শব্দ উৎপন্ন যন্ত্র যেমন মাইক, লাউড স্পিকার, এমপ্লিফায়ার বা সুরযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
- সামাজিক অনুষ্ঠান বা বনভোজনের জন্যও অনুমতি ছাড়া এই ধরনের যন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ।
হর্ন বিক্রি করলে দুই বছরের কারাদণ্ড:
সরকার শব্দদূষণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, নির্ধারিত মাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন, হাইড্রোলিক হর্ন, মাল্টি টিউন হর্ন ও সহায়ক যন্ত্রাংশ প্রস্তুত, আমদানি বা বাজারজাত করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রদান করা হবে।
মোটরযান বা নৌযানে অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার করলে এবং নীরব এলাকায় হর্ন বাজালে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হবে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১ পয়েন্ট কাটা হবে। অন্য বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড ধার্য আছে। তবে সব ক্ষেত্রে বিধিমালা প্রযোজ্য নয়। এর ব্যতিক্রমগুলো হলো:
- মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা বা অন্য ধর্মীয় উপাসনালয়,
- ঈদের জামাত, জানাজা, নাম-সংকীর্তন, শবযাত্রা বা অন্যান্য আবশ্যিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান,
- সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রচার,
- প্রতিরক্ষা, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের দাপ্তরিক কাজ,
- স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখ, মহররম বা সরকার ঘোষিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিবস,
- আকাশযান ও রেলগাড়ি চলাচলের সময়।
বিধিমালার এই কঠোর পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের মান বৃদ্ধি করা।
ভোটের প্রচারেও মানতে হবে শব্দদূষণের বিধি:
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২৫ ভোটের প্রচারে কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, নীরব এলাকায় নির্বাচনি প্রচারে মাইক, লাউড স্পিকার, পাবলিক অ্যাড্রেসিং সিস্টেম বা অন্যান্য উচ্চ শব্দ উৎপন্নকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। নীরব এলাকা ছাড়া অন্য এলাকায় নির্বাচনি প্রচারে নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। তবে শব্দের মাত্রা কোনোভাবেই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।
মাইক ও লাউড স্পিকারের ব্যবহার বিধি:
- কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে একই সময়ে ৩টির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করতে পারবে না।
- প্রচার চলাকালীন মাইক বা শব্দ বর্ধনকারী যন্ত্রের ব্যবহার বেলা ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
- নির্বাচনি প্রচারে ব্যবহৃত যন্ত্রের শব্দ ৬০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না।
প্রচারের সময়সীমা ও শাস্তি:
- নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, মনোনীত বা স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটের তিন সপ্তাহ আগে প্রচার শুরু করতে পারবেন না।
- ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচনি প্রচার শেষ করতে হবে।
- আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১.৫ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে।
- সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা ইসির রয়েছে।
নির্বাচনি প্রচারে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে এই বিধিমালা নিশ্চিত করবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের মান।

