বিচার বিভাগের উন্নয়ন বা কারিগরি প্রকল্প এবং অনুন্নয়ন বাজেটের আওতায় কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত ব্যয় সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা হলে তা অনুমোদন দিতে পারবেন প্রধান বিচারপতি। সরকার প্রয়োজনমতো সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই আর্থিক সীমা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় বা অন্য কোনো উপযুক্ত কারণে বৃদ্ধি করতে পারবে। তবে ব্যয় এর চেয়ে বেশি হলে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনামন্ত্রীর মাধ্যমে তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে উপস্থাপন করতে হবে।
এতে করে অধস্তন আদালতের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির হাতে রাখা হয়েছে। এ নিয়ম সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫-এর মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে। গতকাল রোববার (৩০ নভেম্বর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় অধ্যাদেশটি জারি করে। এর আগে ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ অধস্তন আদালতের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার খসড়া অনুমোদন দিয়েছিল।
অধ্যাদেশের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, অধস্তন আদালত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত উন্নয়ন ও কারিগরি প্রকল্প পর্যালোচনা এবং সুপারিশ করার জন্য ৮ সদস্যের একটি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। কমিটি প্রধান বিচারপতির পরামর্শে তার কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করবে।
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার মধ্যে থাকলে প্রধান বিচারপতি তা অনুমোদন করবেন। এর ওপরে হলে অনুমোদনের জন্য প্রকল্প সরাসরি পরিকল্পনা মন্ত্রীর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে পাঠানো হবে। প্রকল্প গ্রহণ, প্রণয়ন ও যাচাই-বাছাই করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি প্রকল্প যাচাই-বাছাই করার সময় ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা, ২০২২’ অনুসরণ করবে। যাচাই-বাছাইকৃত প্রকল্প চূড়ান্ত নিরীক্ষা ও সুপারিশের জন্য পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটিতে প্রেরণ করা হবে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, অনুন্নয়ন বাজেটের আওতায় কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির সুপারিশকৃত স্কিমের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার মধ্যে থাকলে প্রধান বিচারপতি অনুমোদন দেবেন। এর চেয়ে বেশি হলে অনুমোদনের প্রস্তাব অর্থ বিভাগে পাঠানো হবে। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটির সুপারিশক্রমে প্রধান বিচারপতি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প, বিনিয়োগ প্রকল্প, কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, সংশোধিত বিনিয়োগ প্রকল্প, সংশোধিত কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, সংশোধিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প এবং প্রকল্পের আন্তঃঅঙ্গ ব্যয় সমন্বয়, মেয়াদ বৃদ্ধি ও বরাদ্দ ব্যবহার সম্পর্কিত প্রস্তাবও অনুমোদন করবেন।
অধ্যাদেশের ১১ ধারায় বাজেট ব্যবস্থাপনার নিয়ম ঘোষণা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রত্যেক অর্থবছরের জন্য অধস্তন আদালত, প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের অনুমিত আয়-ব্যয়সহ একটি বিবৃতি প্রস্তুত করবে। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জন্যও অনুমিত আয় ও ব্যয়ের বিবৃতি তৈরি করতে হবে। এই বিবৃতিগুলি সংশ্লিষ্ট অর্থবছর শুরু হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে প্রস্তুত করতে হবে।
বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
- সুপ্রিম কোর্ট ও বিচার বিভাগে নিযুক্ত বিচারক ও কর্মচারীদের বেতন ও ভাতাদি
- দেশের বিচার প্রশাসন পরিচালনার প্রশাসনিক ব্যয়
- সুপ্রিম কোর্ট, অধস্তন আদালত, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, কমিশন, ইনস্টিটিউট, একাডেমি প্রভৃতি সংস্থার আবর্তক ও উন্নয়ন ব্যয়
- গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়
প্রধান বিচারপতি এই বিবৃতি সরকারের আর্থিক বিবৃতির সঙ্গে সংযুক্ত করে সংসদে উপস্থাপনের জন্য অর্থমন্ত্রীর নিকট প্রেরণ করবেন। সরকারের বাজেট প্রণয়নে সুবিধার জন্য সুপ্রিম কোর্ট এবং সচিবালয়কে কৌশলগত পর্যায়ে রাজস্ব ও প্রাপ্তির প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা এবং সম্ভাব্য ব্যয়সীমার প্রাক্কলন সরকারের কাছে প্রেরণ করতে হবে। বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ পুনঃউপযোজনের সমস্ত ক্ষমতা প্রধান বিচারপতির হাতে থাকবে।
অধ্যাদেশের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, সংবিধানের ২২, ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নামে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠন করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির হাতে থাকবে। সচিবালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হবেন সুপ্রিম কোর্ট সচিব। অধ্যাদেশের ৫ ধারায় সচিবালয়ের কার্যাবলী বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টকে দেশের বিচার প্রশাসন পরিচালনায় সহায়তা দিতে অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে।
এছাড়া সচিবালয় কর্তৃক হবে:
- অধস্তন আদালতের প্রতিষ্ঠা বা বিলোপ, সংখ্যা, গঠন ও এখতিয়ার নির্ধারণ
- অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিচারক, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ ও শর্তাবলি নির্ধারণ
- সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ সৃজন, বিলোপ, বিন্যাস, নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, শৃঙ্খলা, ছুটি ও প্রশাসন সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন
- সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীর পদ সৃজন, বিলোপ ও বিন্যাস
- সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ ও হালনাগাদ
- সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রতিষ্ঠিত কমিটিকে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান
- বিচার কর্মে নিয়োজিত সার্ভিস সদস্যদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটি সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- সার্ভিস সদস্যদের পদায়ন ও বদলি নীতিমালা প্রণয়ন
- অধস্তন আদালত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও সচিবালয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বাজেট ব্যবস্থাপনা
- সুপ্রিম কোর্ট, অধস্তন আদালত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও সচিবালয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উন্নয়ন বা কারিগরি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন
- প্রধান বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট বিচারকদের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধান
- সার্ভিস সদস্য ও সচিবালয় ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক পদক্ষেপ গ্রহণ
অধ্যাদেশের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রশাসনের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের উপর ন্যস্ত থাকবে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণ করতে সচিবালয় সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত সকল প্রশাসনিক কাজ রাষ্ট্রপতির পক্ষে সম্পাদন করবে। এই কার্যাদি সুপ্রিম কোর্ট সচিবের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার জেনারেলের পরামর্শক্রমে সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হবে। যদিও সচিবালয় সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান করবে, তবে আইন ও বিচার বিভাগের কার্যপরিধির বাইরে, অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় সার্ভিস সদস্যদের পদায়ন বা বদলি রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্বাধীন সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদের বিধিমালা অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শে সম্পাদিত হবে।
অধ্যাদেশ জারির উদ্দেশ্য:
অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি। এছাড়া ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণ, আপিল বিভাগের ৭৯/১৯৯৯ সিভিল আপিল রায়ের বাস্তবায়ন এবং সংসদ ভাঙা অবস্থায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনের কারণে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য, প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে গত বছরের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল।

