৫৩ বছর আগে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত এবং ২৬ বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের ‘পৃথকীকরণ’ বাস্তবায়িত হয়নি। এবার, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সেই দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত উদ্যোগটি এগিয়ে নিয়ে এসেছে।
প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রীকরণের তাগিদ দিয়েছেন। ৩০ নভেম্বর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সহযোগিতায় বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবায়ন হলো। এ পদক্ষেপের পর সুপ্রিম কোর্টের দুই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শুভকামনা জানিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, এই অধ্যাদেশ বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন ও কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য:
নির্বাহী বিভাগের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের উদ্দেশ্যে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কার্যাবলী যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে এবং বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন কার্যকর করতে এটি প্রয়োজনীয়।
এতে সংবিধানের ২২, ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাসদার হোসেন মামলার সুপ্রিম কোর্টের রায়কেও ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, অধ্যাদেশটি বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি নিশ্চিত করেছে।
যেভাবে চলবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়:
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশে পরিষ্কার করা হয়েছে, সচিবালয়টি কার্যকরভাবে চালু হলে সরকার সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে ধারা-৭-এর বিধানাবলী সরকারি গেজেটে প্রকাশ করে প্রযোজ্য করবে। ধারা ৭ অনুসারে সচিবালয়টি হবে সার্ভিস প্রশাসনের মূল প্রতিষ্ঠান। এটি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির পক্ষে পালন করবে।
সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কার্যাদি সচিবালয়ের সচিব সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্ট কমিটির পরামর্শের জন্য উপস্থাপন করবেন। ওই কমিটির সদস্যরা আপিল বিভাগের বিচারকগণ দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে মনোনীত হবেন। তবে, উপ-ধারা (২)-এর বিধান সত্ত্বেও, আইন ও বিচার বিভাগের কার্যপরিধিতে থাকা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় সার্ভিস সদস্যদের পদায়ন বা বদলি সংক্রান্ত কাজ রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্বাধীন সংবিধান ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে সম্পন্ন হবে।
সচিবালয় গঠন ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো:
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের ৪ ধারায় স্বতন্ত্র সচিবালয়ের কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবিধানের ২২, ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এই সচিবালয় গঠন করা হবে। সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান বিচারপতির হাতে থাকবে। সচিবালয়টির প্রশাসনিক প্রধান হবেন সচিব।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সচিবালয় সরকারের মন্ত্রণালয়সমূহের সমমর্যাদা প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অধিকারী হবে। এতে একজন সচিব ছাড়াও অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োজিত থাকবেন। সচিব সরকারী সিনিয়র সচিবের সমমর্যাদা ও সুবিধা ভোগ করবেন। সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী সচিবের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন। এছাড়া প্রধান বিচারপতি প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্পণ করে প্রয়োজনীয় আদেশ জারি করতে পারবেন।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যাবলি:
অধ্যাদেশের ৫ ধারায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্য কোনো আইনের বিধান থাকলেও সচিবালয় নিম্নলিখিত দায়িত্ব পালন করবে:
- ক. দেশের বিচার প্রশাসন পরিচালনায় সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা প্রদান, অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও সচিবিক দায়িত্ব পালন।
- খ. অধস্তন আদালতের প্রতিষ্ঠা বা বিলোপ, সংখ্যা, গঠন ও এখতিয়ার নির্ধারণ।
- গ. অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের বিচারক, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ ও কর্মসংক্রান্ত শর্তাবলি নির্ধারণ।
- ঘ. সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদ সৃজন, বিলোপ, বিন্যাস, নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, শৃঙ্খলা, ছুটি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় পরিচালনা।
- ঙ. সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের পদ সৃজন, বিলোপ ও বিন্যাস।
- চ. সচিবালয়, রেজিস্ট্রি ও ট্রাইব্যুনালের সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ ও প্রয়োজনে হালনাগাদ।
- ছ. অধস্তন আদালত, রেজিস্ট্রি ও সচিবালয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ ও হালনাগাদ।
- জ. সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের পদ সৃজন কমিটিকে প্রশাসনিক ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান।
- ঝ. বিচারিক কর্মে নিয়োজিত সার্ভিস সদস্যদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা, ছুটি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
- ঞ. সার্ভিস সদস্যদের পদায়ন ও বদলির নীতিমালা প্রণয়ন।
- ট. সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট ব্যবস্থাপনা।
- ঠ. উন্নয়ন বা কারিগরি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।
- ড. প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট, অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের বিচারকগণের নিরাপত্তা তত্ত্বাবধান।
- ঢ. সার্ভিস সদস্য ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, বৃত্তি ও অন্যান্য সম্পর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ।
- ণ. বিচারিক সেবার মানোন্নয়ন ও বিচার বিভাগের সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা, প্রকাশনা এবং পদক্ষেপ গ্রহণ।
- ত. অন্যান্য দেশের সংবিধানিক আদালত, বিচার বিভাগ, বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত সংস্থা এবং আইনশাসন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমে সহায়ক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ইত্যাদি সম্পাদন ও বাস্তবায়ন।
- থ. সার্ভিস সংক্রান্ত বিধিমালা বা প্রাসঙ্গিক আইনের অধীনে অর্পিত যে কোনো দায়িত্ব পালন।
- দ. অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রধান বিচারপতি কর্তৃক আরোপিত দায়িত্ব পালন।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য আইন ও বিচার বিভাগ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
৬ ধারা অনুযায়ী সচিবালয়ের কার্যক্রম:
- ক. সচিবালয় সরকারের যে কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর বা অফিস এবং অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে।
- খ. কোনো ব্যক্তি বা সরকারের মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দপ্তর যদি সচিবালয়ের সঙ্গে কোনো বিষয়ে যোগাযোগ করতে চায়, তা সরাসরি করতে পারবে।
- গ. প্রধান বিচারপতি আদেশের মাধ্যমে সচিবালয়ের কার্যাবলি বণ্টন, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার নিয়ম নির্ধারণ করতে পারবেন।
অধ্যাদেশের ৮ ধারায় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অধীনে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি গঠন ও কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিটির উদ্দেশ্য হলো অধস্তন আদালত, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি এবং সচিবালয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন বা কারিগরি প্রকল্প চূড়ান্ত নিরীক্ষা ও সুপারিশ প্রদান।
কমিটির সদস্যবৃন্দ:
- ক. প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের ১ জন বিচারক, যিনি কমিটির সভাপতিও হবেন।
- খ. প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের ২ জন বিচারক।
- গ. সচিব, আইন ও বিচার বিভাগ।
- ঘ. সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
- ঙ. সচিব, পরিকল্পনা বিভাগ।
- চ. রেজিস্টার জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট।
- ছ. সচিব, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, যিনি সদস্য-সচিবও হবেন।
কমিটির কার্যপদ্ধতি:
- ক. কমিটি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিজ কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
- খ. সুপারিশকৃত প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার মধ্যে থাকলে প্রধান বিচারপতি অনুমোদন দেবেন; এর বেশি হলে পরিকল্পনা মন্ত্রীর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হবে।
- গ. প্রকল্প গ্রহণ, প্রণয়ন ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হবে।
- ঘ. প্রকল্প যাচাই-বাছাই কমিটি ‘সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা, ২০২২’ অনুসরণ করে কাজ করবে।
- ঙ. যাচাই-বাছাইকৃত প্রকল্প চূড়ান্ত নিরীক্ষা ও সুপারিশের জন্য মূল কমিটিতে প্রেরণ করা হবে।
- চ. অনুন্নয়ন বাজেটের আওতায় কার্যক্রমের জন্য ৫০ কোটি টাকার মধ্যে সুপারিশকৃত স্কিম প্রধান বিচারপতির অনুমোদন পাবে; এর বেশি হলে প্রস্তাব অর্থ বিভাগে প্রেরণ করা হবে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সরকার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিয়ে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপ-ধারা (৩) ও (৭)-এ উল্লিখিত আর্থিক সীমা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়াতে পারবে বা অন্য কোনো উপযুক্ত কারণে পরিবর্তন করতে পারবে। অধ্যাদেশে বিচার প্রশাসন সংক্রান্ত কমিটি গঠন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কমিশন, বাজেট ব্যবস্থাপনা, অর্থ ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, শর্তাবলি ও বেতনসহ অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। তিনি বলেন, “পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হলো। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এই ফলাফল পাওয়া গেল। আলহামদুলিল্লাহ।” অন্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “শুভ কামনা। তবে এর কার্যকারিতা সঠিক বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।”
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ইতিহাস ও প্রথম পদক্ষেপ:
১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির মধ্যে বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছিল। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবেন।” এ ধারা হলো বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রথম সাংবিধানিক ভিত্তি। দীর্ঘ সময় ধরে এটি বাস্তবায়নের অপেক্ষা ছিল, এবং সাম্প্রতিক অধ্যাদেশটি সেই ৫৩ বছরের কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
মাসদার হোসেন মামলা:
১৯৭২ সালের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের পরও বিচার বিভাগের স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড নিয়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। সেই ক্ষোভের প্রেক্ষিতে তৎকালীন বিচারক মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালে চূড়ান্ত শুনানির পরে জুডিসিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র করার আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ রায় দেন।
রায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়:
- সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে।
- বিচার বিভাগ জাতীয় সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকবে না।
- জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ সকল বিচারক স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।
- জুডিসিয়ারির (নিম্ন আদালত) বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন ও বরাদ্দে নির্বাহী বিভাগের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না; এই দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের।
বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ: ঘোষণা থেকে বাস্তবায়নের পথে:
আপিল বিভাগের মাসদার হোসেন রায়ের প্রায় ৮ বছর পর, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করা হয়। তবে সেই ঘোষণা কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
নতুন উদ্যোগের সূচনা হয় গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর, যখন দেশের প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের কয়েকজন বিচারপতি পদত্যাগ করেন। ১০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদকে দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে অধস্তন আদালতের বিচারকদের উদ্দেশ্যে অভিভাষণ দেন। তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক। সংবিধানের ১১৬ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন। তবে বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে না, যতদিন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বিলোপ করে জরুরি ভিত্তিতে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।”
সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে:
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অন্যতম হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “সংবিধানে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার কথা থাকলেও সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়নি। তবে এই প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৭৯/১৯৯৯ নম্বর সিভিল আপিল মামলার রায়ে (মাসদার হোসেন মামলা) নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের পূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এই রায় ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির বাস্তবায়নের পথকে সুগম করেছে।” রায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেশের বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা, যা বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব:
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংস্কার কমিশন সুপারিশ দিয়েছে। কমিশন প্রস্তাব করেছে, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে অর্থবহ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কমিশনের মূল প্রস্তাবগুলো হলো:
- ক. বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করার লক্ষ্যে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন।
- খ. সচিবালয় স্থাপনের জন্য একটি স্বতন্ত্র আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়ন।
- গ. ‘রুলস অব বিজনেস’ যথাযথভাবে সংশোধন।
- ঘ. এলোকেশন অব বিজনেস সংশোধন করে আইন ও বিচার বিভাগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যপরিধি পৃথকীকরণ ও স্ব স্ব কার্যপরিধি সন্নিবেশিত করা।
- ঙ. বিচার বিভাগের দাপ্তরিক কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নির্দেশমালা প্রণয়ন।
- চ. সচিবালয়ের জন্য পৃথক জনবল কাঠামোসহ সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তুত ও অনুমোদন করা। অনুমোদিত কাঠামোয় জনবলের পদ সৃষ্টিসহ অফিস সরঞ্জামাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- ছ. পৃথক অবকাঠামো, জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা।
হাইকোর্ট বিভাগের রায়:
গত বছরের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবী একটি রিট দায়ের করেন। চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট চূড়ান্ত রায় দেন। রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেছেন, বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রায়ে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুসারে রায়ের অনুলিপি গ্রহণের পর তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

