একজন আসামি হাইকোর্টে জামিন শুনানির জন্য আইনজীবী নিয়োগ করতেই পারেন। মামলার ধরন ও প্রকৃতি বিবেচনায় অনেক সময় সিনিয়র আইনজীবীও নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশেষ করে জামিনে সুবিধা পাওয়ার আশায় ফাইলিং আইনজীবীর পরামর্শে বা আসামির চাহিদায় সিনিয়র আইনজীবী যুক্ত করা হয়। এটি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি।
আইন অঙ্গনে প্রচলিত ধারণা হলো, সিনিয়র আইনজীবী যুক্ত থাকলে মামলায় প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ বাড়ে। সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত আইনজীবীদের কাছে বিষয়টি নতুন নয়। সংবিধান অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগ একজন আসামির মৌলিক অধিকার।
তবে বাস্তবতা হলো, আগাম জামিন ছাড়া অধিকাংশ ফৌজদারি মামলায় সাধারণত আসামিকে সরাসরি আদালতে হাজির হতে হয় না। ফলে আইনজীবীদের পক্ষে আসামিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনা বা জানার সুযোগ অনেক সময় থাকে না। সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানি হয় মূলত অধস্তন আদালতের নথিপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে।
এই নথিপত্রের মধ্যে থাকে এজাহার বা এফআইআর, চার্জশিট, জব্দ তালিকা, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, পিসি বা পিআর এবং সর্বশেষ আদালতের আদেশ। এসব কাগজপত্র বিশ্লেষণ করেই আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে শুনানিতে অংশ নেন। এখানে আসামির ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে মামলার কাগজপত্রই বেশি গুরুত্ব পায়।
একটি ফৌজদারি মামলার সূচনা হয় থানায় এজাহার দায়েরের মাধ্যমে। এরপর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে তা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠান। ম্যাজিস্ট্রেট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট দাখিল করলে মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়।
জামিন শুনানির ক্ষেত্রে সিনিয়র আইনজীবীদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে তারা আইনি সুযোগ ও প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো বেশি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে পারেন। এ কারণেই একজন জুনিয়র আইনজীবীর তুলনায় সিনিয়র আইনজীবীরা জামিন সংক্রান্ত শুনানিতে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পান। আইনজীবীদের মতে, জামিন পাওয়ার জন্য আসামিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনার প্রয়োজন নেই। বরং মামলার ধারা, অভিযোগের প্রকৃতি এবং আইনি ব্যাখ্যার মাধ্যমেই আসামির জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, ইনকিলাব মঞ্চের ওসমান হাদীকে গুলি করা ঘটনার পর আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে অভিযুক্ত এক আসামির আগের জামিনের বিষয়টি। জানা যায়, ওই আসামির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মোহাম্মদপুর এলাকায় ডাকাতির মামলায় অস্ত্রসহ অভিযোগ ছিল। সেই মামলায় তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন। এই জামিন কীভাবে হলো তা নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে।
তবে আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, আসামির জামিন কীভাবে হলো বা কোন আইনজীবী শুনানি করেছেন, সেটাই মুখ্য বিষয় নয়। বরং কোন প্রেক্ষাপটে এবং কোন আইনের সুযোগে জামিন দেওয়া হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আইনজ্ঞরা বলছেন, একজন আসামি জামিন পাওয়ার পর পরবর্তীতে একই ধরনের অপরাধে জড়ালে বা কোনো গুরুতর অপরাধ ঘটালে তার দায় আইনজীবীর ওপর বর্তায় না। আইনজীবীর দায়িত্ব হলো আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। ভবিষ্যতে আসামি কী করবে, সেটির দায়ভার আইনজীবীর ওপর দিলে দেশে কোনো আইনজীবীই আসামির পক্ষে দাঁড়াতে পারবেন না। এতে একজন নাগরিক তার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
আইন পেশার দায়িত্ব অনুযায়ী, একজন আইনজীবী যেকোনো আসামিকে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ করে দেন। এ ক্ষেত্রে সিনিয়র আইনজীবীর তুলনায় ফাইলিং আইনজীবীর দায়িত্ব অনেক বেশি। বাস্তবে অধিকাংশ সময় সিনিয়র আইনজীবীরা মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে শুনানিতে অংশ নেন। জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা আদালতের। ফলে জামিন পাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারকরা শুনানিকালে ঘটনাগত প্রশ্নের চেয়ে আইনের প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দেন। তবে কিছু বেঞ্চে আইনের প্রশ্নের পাশাপাশি সিনিয়র আইনজীবীদের উপস্থাপিত যুক্তিকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। কারণ সিনিয়র আইনজীবীরা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে মামলার মেরিট তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরতে পারেন।
এ কারণেই অনেক সময় জুনিয়র আইনজীবীরা ঝুঁকি এড়াতে সিনিয়র আইনজীবী নিয়োগ করেন। এতে সিনিয়ররা তুলনামূলকভাবে বেশি অগ্রাধিকার পান। আইন অঙ্গনে এটি একটি পরিচিত বাস্তবতা।
আমি এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পৃথিবীর এই লীলাখেলায় একজন বিচারক আল্লাহর পর সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধ যিনি পৃথিবীতে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আর জীবনের শেষে হাশরের ময়দানে আল্লাহই প্রকৃত ন্যায় বিচারক এবং ন্যায়দণ্ডের দাঁড়িপাল্লার নিক্তিতে সঠিক বিচার করবেন। তখন কিন্তু এই দুনিয়ার সকল বিচারকও আল্লাহর আদালতে ফরিয়াদ করবেন। সাথে সকল সাধারণ জনগণও থাকবেন।
এদেশের বিচার ব্যবস্থা ২০০ বছরের পুরনো প্রাগৈতিহাসিক স্টাইলে চলে। কাউকে এক পাক্ষিক দোষারোপ করা একধরণের দায়সারা ব্যাপার। এখানে বহু দফতর জড়িত। আগে বিচার বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করসহ সকল মান্ধাতার আমলের বিচারিক পদ্ধতি বিলুপ্ত করতে হবে। এদেশের জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে সকল দফতরকে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথসয়, আজকে হাদী, কালকে আমি, পরশু আপনিও এই হত্যাকান্ডের শিকার হতে পারেন।
লেখক : মোঃ ওবাইদুল্যাহ আল মামুন সাকিব; অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

