গত ৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রেডিসন হোটেলে ইউএনডিপি আয়োজিত একটি সেমিনারে দেশের বাণিজ্যিক আদালত নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে অংশগ্রহণকারীদের সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। তবে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং আদালতের লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে।
বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ব্যবসায়িক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য। বর্তমানে বাণিজ্যিক বিষয়ভিত্তিক সিভিল মামলা যেমন চুক্তি, অংশীদারি লেনদেন, ট্রেডমার্ক, প্যাটেন্ট, ব্যবসায়িক পাওনা আদায় এবং ব্যবসার মালিকানা সাধারণ দেওয়ানি আদালতে চলে। কোম্পানি ও এডমিরাল্টি সম্পর্কিত মামলা হাইকোর্ট বিভাগে হয়। লেবার সংক্রান্ত মামলার জন্য আলাদা লেবার কোর্ট রয়েছে। এছাড়া অর্থঋণ আদালতের কাজও ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্যবসায়িক অপরাধের মধ্যে আছে প্রতারণা, জালিয়াতি, আত্মসাৎ, অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গ। ব্যবসার মাল চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও ঘুষ আদায়কেও বাণিজ্যিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু এসব মামলা সাধারণ ফৌজদারি আদালতে চলায় হাজারো অন্যান্য মামলার ভীড়ে বাণিজ্যিক বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না।
দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক বিরোধের বিলম্ব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাই বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তবে আধা-দেওয়ানি ও আধা-ফৌজদারি বিষয় হিসেবে চেকের মামলা সাধারণ আদালতেই দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে এবং ব্যবসায়িক পাওনা আদায় সম্ভব হচ্ছে।
বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন:
১। জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজকে বাণিজ্যিক আদালতের বিচারক করা হচ্ছে। আপীল হবে মাননীয় হাইকোর্টে। যে কোন মামলার এক পক্ষ মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটানোর চেষ্টা করে, টাকা-পয়সা দেনা থাকলে আরও বেশি বিলম্ব ঘটানোর চেষ্টা করে, ফলে কথায় কথায় মাননীয় হাইকোর্টে আপীল হতে পারে। যুগ্ম জেলা জজকে মূল বাণিজ্যিক আদালত ও জেলা জজকে আপীল আদালত করা হলে জেলা থেকে রাজধানীতে মামলার উঠা-নামা কমবে। আইনটি কারা ড্রাফট করেছেন, এই বিষয়ে বাস্তবে অভিজ্ঞদের সাথে কোন পরামর্শ করা হয়েছে কিনা, বিজ্ঞ আইনজীবীগণ মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগে তাদের প্র্যাকটিস বাড়ানোর জন্য এমন বন্দোবস্ত করছেন কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন রয়েছে।
২। বাণিজ্যিক ধরনের বিরোধের সংখ্যা কম নয়, যেগুলো বর্তমানে সাধারন আদালতে চলমান আছে। এখন বাণিজ্যিক আদালতের সংখ্যা কম হলে এক একটি আদালতে হাজার হাজার মামলার পাহাড় তৈরী হবে, যথেষ্ট সংখ্যায় আদালত প্রতিষ্ঠা না করলে বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির আসল উদ্দ্যেশ্য ব্যাহত হবে।
৩। বাণিজ্যিক বিরোধের সংজ্ঞা ও বাণিজ্যিক আদালতের এখতিয়ার নির্ধারনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কারন বর্তমানে কোম্পানি ও এডমিরাল্টি, অর্থঋন, চেকের মামলা, চুক্তি হতে উদ্ভূত মামলা, কপিরাইট-প্যাটেন্ট ইত্যাদি বাণিজ্যিক বিষয়ে পৃথক পৃথক আদালত কর্মরত আছে।
৪। জমির মামলাকে বাণিজ্যিক বিরোধ হিসেবে নিশ্চয় বিবেচনা করা হচ্ছে না। যে জমিতে ব্যবসার কারখানা, অফিস, গোডাউন ইত্যাদি আছে বা তৈরী হবে, সে জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকলে ও নিষেধাজ্ঞা থাকলে ব্যবসাও বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য । তাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দাবি বা স্বার্থ জড়িত আছে এমন সব জমির মামলাকে বাণিজ্যিক আদালতের এখতিয়ারভূক্ত না করলে এই আদালতের উদ্দ্যেশ্য বিফলে যাবে।
৫। ব্যবসার মাল চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই হয়ে গেলে ! ব্যবসার উপর বাপ-দাদার হক হিসেবে বেহায়া চাঁন্দাবাজরা ঝাপিয়ে পড়লে! ব্যবসার পদে পদে নির্লজ্জ সরকারি কর্মচারীরা ঘুষ আদায় করলে ! এসব অপরাধও ব্যবসাকে জঘন্যভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এই দেশে সারা দিন ভিক্ষা করে দুইশ টাকা আয় করা ফকিরকেও সেই দুইশ টাকা হতে ভ্যাট দিতে হয়, সেই দুইশ টাকা থেকে ফকিরকে ঘুষ আর চাঁদাও দিতে হয়, কারণ ব্যবসায়ীরা মালের দামের সাথে ঘুষ-চাঁদা যোগ করে জনগন থেকে আদায় করে নেয়। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রকৃত ভাল চাইলে “ফৌজদারী বাণিজ্যিক আদালত” প্রতিষ্ঠা করা জরুরী।
৬। জমির মামলাই এই দেশের আসল মামলা, mother case. জমির বিরোধ হতেই অধিকাংশ দেওয়ানি ও ফৌজদারী মামলার সূত্রপাত হয়। এটাই অবিচারের মূল রোগ, এটা নির্মূল করার বিশেষ ব্যবস্থা না নিয়ে জ্বর ও ব্যথার মলমের মত ছোটখাট ব্যবস্থায় দেশ ও জনগনের জন্য টেকসই সমাধান হবে না, নতুন নতুন ব্যথা দেখা দিতেই থাকবে। তাছাড়া, ব্যবসায়ীরা বিশেষ আদালত থেকে দ্রুত বিশেষ বিচার পাবে, অন্য জনগনের মামলা কেন যুগ যুগ ধরে চলবে !!! জনগনের যে কোন মামলাকেই দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে ন্যায় বিচারের ব্যবস্থা করা একটি রাষ্ট্রের প্রধান ও মৌলিক উদ্দ্যেশ্য।
৭। ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিলেই হবে না; ভেজাল ও ওজনে কম দেয়া প্রতারক ব্যবসায়ী, নানা রকমের ঠক, ব্যবসার নামে দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসকারী, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট, দুই টাকার মাল দিয়ে বিশ টাকা ছিনতাইকারী ইত্যাদি অসৎ ও নীতিহীন ব্যাবসায়ীদের লুটতরাজ হতে দেশ ও জনগনকে রক্ষা করার জন্য তাদেরকেও দ্রুত ও কঠোর বিচারের আওতায় আনা আবশ্যক।
৮। Ease of business rank, enforcement of contract rank ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত হতাশা ও লজ্জা জনক!!! অসংখ্য ঘাট, মাকড়ার জালের চেয়েও জঘন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পদে পদে ঘাটে ঘাটে দুর্নীতি, ঘুষ-চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, টেন্ডারবাজি- এসব থেকে ব্যবসায়ীদেরকে মুক্তি দিতে হবে, যেন সৎ ও নীতিবান লোকেরা ব্যবসায় আসতে ও থাকতে উৎসাহিত হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতির মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ ও দেশের উন্নয়নের জন্য সার্বিক ও টেকসই সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৯। শুনেছি বাণিজ্যিক আদালতে বাণিজ্যিক বিষয়াদিতে বিশেষভাবে দক্ষ বিচারক নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু স্মরনাতীত কালে দেশে কোন বাণিজ্যিক আদালত ছিল না, তাহলে বাণিজ্যিক বিষয়ে বিশেষভাবে দক্ষ বিচারক কোথায় কেমনে তৈরী হল!!! তবুও আমার কাছে এই সমস্যার একটি সমাধান আছে, তা হল: যে ছাত্র গণিত ভাল বুঝে, সে ছাত্র ভাল বুঝবে না এমন কোন বিষয় নাই; একইভাবে অতি জটিল বংশ পরম্পরা, জাল-জালিয়াতি, প্রতারনা, ওয়ারিশ গোপন ও জাল ওয়ারিশ সৃজন, অন্যান্য তথ্য গোপন, অজস্র মিথ্যার উপর মিথ্যার গাথুনি, এক সত্যের উপর সাত মিথ্যার কারিগরি মিশ্রন, সরকারী রেকর্ডপত্রের জঘন্য দুরবস্থা, খতিয়াদির আনা গন্ডা কড়া ক্রান্তির জটিল প্যাচ ও ভুল-ভ্রান্তি অতিক্রম করে এই দেশের জমির মামলা যিনি ভাল বুঝেন, তিনি বাণিজ্যিক বিরোধ হতে উদ্ভূত মামলাও ভাল বুঝবেন। দেওয়ানি প্রকৃতির বাণিজ্যিক বিরোধ বা মামলা গুলো Civil Disputes বা suits of civil nature হতেই আসবে। সিভিলে দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিচারকগণ এখানে ভাল করবেন, তাদেরকে দেশ-বিদেশে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিলে আরো ভাল বুঝবেন।
লেখক : মোহাম্মদ আবদুল কাদের, জেলা ও দায়রা জজ। সূত্র: ল’ ইয়ার্স ক্লাব

