বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নটি যতটা না অভিবাসন বা প্রবাসজীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত, তার চেয়ে অনেক বেশি যুক্ত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের নৈতিক ভিত্তির সঙ্গে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের একটি অংশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে যে বিতর্ক আবার সামনে এনেছেন, সেটি নতুন কিছু নয়। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে যখন এই প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশন, আদালত ও সংবাদমাধ্যমে একসঙ্গে আলোচিত হয়, তখন তা আর কেবল ব্যক্তিগত অধিকার বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় থাকে না; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দর্শন ও গণতন্ত্রের কাঠামোকে স্পর্শ করে।
বাংলাদেশের সংবিধান সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছে। ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য হতে হলে প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তাঁর বয়স কমপক্ষে পঁচিশ বছর হতে হবে। এই যোগ্যতার বাইরে সংবিধান মূলত অযোগ্যতার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অনুচ্ছেদ ৬৬(২) (চ), যেখানে বলা হয়েছে যিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন অথবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা ঘোষণা করেন, তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে থাকা থেকে অযোগ্য হবেন। এই বিধানটি শুধু একটি আইনি নিষেধাজ্ঞা নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি মৌলিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, রাষ্ট্রের প্রতি আইনপ্রণেতার আনুগত্য অবিভক্ত, অখণ্ড ও নিঃশর্ত হতে হবে।
এই সাংবিধানিক অবস্থানকে বিচার বিভাগ বহু আগেই স্পষ্ট করেছে। ২০০২ সালে আবদুল হালিম (মো.) বনাম আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার, ৫৪ ডি.এল.আর. (২০০২) ৪২ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ অনুচ্ছেদ ৬৬(২) (চ)-এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, এই অনুচ্ছেদকে তার সাধারণ অর্থে পড়তে হবে। আদালতের মতে, কেউ যদি বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করেন, তবে তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বজায় রাখলেও সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য অযোগ্য হবেন। আদালত এখানে ‘দ্বৈত আনুগত্য’-এর ধারণাটিকে গুরুত্ব দেন এবং বলেন, সংসদের মতো একটি সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো ব্যক্তির থাকা সমীচীন নয়, যার আইনি আনুগত্য একাধিক রাষ্ট্রের প্রতি বিভক্ত। এই রায় দীর্ঘদিন ধরে দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্কে একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।
তবে সংবিধান কোনো স্থির দলিল নয়; সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে এর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগে পরিবর্তন আসে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৬৬-তে ৬৬ (২ক) যুক্ত হয়। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়, জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক কেউ যদি বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করেন, কিন্তু পরে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন, তাহলে তাঁকে এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যে বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য করা হবে না। এই বিধানটি দ্বৈত নাগরিকত্ব বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। অনেকেই একে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি সাংবিধানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন। কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে, যা উপেক্ষা করলে পুরো বিতর্কটি বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে।
অনুচ্ছেদ ৬৬(২ক) দ্বৈত নাগরিকত্বকে সংসদ নির্বাচনের জন্য বৈধ করে দেয়নি। বরং এটি একটি শর্তাধীন ছাড় দিয়েছে যে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করা হলে তবেই অযোগ্যতা কাটবে। অর্থাৎ সংবিধান দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রেখে সংসদ সদস্য হওয়ার কোনো অনুমতি দেয়নি; বরং দ্বৈত নাগরিকত্বের অবসান ঘটানোর পর যোগ্যতা পুনরুদ্ধারের কথা বলেছে। এখানেই প্রশ্নটি ঘনীভূত হয়—বিদেশি নাগরিকত্ব “ত্যাগ” বলতে কী বোঝাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সংবিধানের ভেতরে নেই; নাগরিকত্ব আইনেও এর ইঙ্গিত রয়েছে। Citizenship Act, 1951-এর ধারা ১৪-এ দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে যে কাঠামো দেওয়া হয়েছে, তা মূলত একটি স্ট্যাটাস-ভিত্তিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ একটি আইনগত পরিণতির বিষয়, কেবল ইচ্ছা বা ঘোষণার বিষয় নয়। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের আইনে নির্ধারিত পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নাগরিকত্বের আইনগত অবসান ঘটাতে হয়।
সংবিধান ও নাগরিকত্ব আইন একত্রে পড়লে বোঝা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত বিদেশি নাগরিকত্ব আইনগতভাবে বহাল থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংসদীয় অযোগ্যতাও বহাল থাকবে।
এছাড়াও, হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশন নং ১০৪৬৩/২০২৩ এ স্পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য কেবল আবেদন করাই যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আবেদন গ্রহণ না করে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাংবিধানিক উদ্দেশ্যে ওই ব্যক্তি একজন বিদেশি নাগরিক হিসেবেই গণ্য হবেন। এক্ষেত্রে সময় নির্ধারণের চূড়ান্ত পর্যায় হলো মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের (scrutiny) তারিখ। আদালত স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, কেবল একটি আবেদন দাখিল করাই যথেষ্ট নয়। দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি ব্যক্তির ইচ্ছা, প্রচেষ্টা বা প্রশাসনিক বিলম্বের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং তার সুনির্দিষ্ট আইনি অবস্থার (legal status) ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।
এই বাস্তবতা আরো স্পষ্ট হয় যখন আমরা অন্যান্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের পদ্ধতির দিকে তাকাই। যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ তখনই কার্যকর হয়, যখন Home Office সংশ্লিষ্ট ঘোষণাটি চূড়ান্তভাবে নিবন্ধন করে। তার আগে ব্যক্তি আইনগতভাবে ব্রিটিশ নাগরিকই থেকে যান, তিনি যতই ঘোষণা বা আবেদন করে থাকুন না কেন। যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়াটি একাধিক ধাপে সম্পন্ন হয়। সমস্ত প্রক্রিয়া শেষে দূতাবাস বা কনস্যুলেটে শপথ নেওয়ার পর Department of State কর্তৃক Certificate of Loss of Nationality (CLN) অনুমোদিত হলে তবেই নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে স্বীকৃত হয়। এই উদাহরণগুলো দেখায়, অধিকাংশ দেশেই নাগরিকত্ব ত্যাগ একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ব্যক্তির হাতে নয়। কোনো ব্যক্তির সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশ বা একটি লিখিত আবেদনই যথেষ্ট নয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি যুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য হলো বাংলাদেশ সরকার নিজেই বহু বছর ধরে নির্দিষ্ট দেশসমূহের সঙ্গে দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশাসনিক স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ফলে বিদেশি প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে তাঁদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা ন্যায়সংগত নয়। এই যুক্তি মানবিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। কিন্তু এর বিপরীতে একটি কঠোর সাংবিধানিক বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে—সংসদ সদস্য হওয়া কেবল নাগরিক অধিকার নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদারিত্ব। সেখানে আনুগত্যের প্রশ্নে কোনো ধোঁয়াশা সংবিধান অনুমোদন করে না।
এই বিতর্কে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। Representation of the People Order (RPO), 1972 অনুযায়ী মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে এবং সেই সময়েই প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হয়। ভবিষ্যতে কোন সংসদ সদস্য প্রার্থীর দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ “হয়তো সম্পন্ন হবে”এই আশার ওপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন পরিচালনা করা কমিশনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে প্রতি নির্বাচনে এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে মনোনয়ন গ্রহণ, বাতিল, আপিল ও রিটের স্রোত চলতেই থাকবে।
এই অবস্থায় প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট, লিখিত ও প্রমাণভিত্তিক ব্যাখ্যা। নির্বাচন কমিশনের উচিত স্পষ্ট করে বলা—বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ কখন সম্পন্ন বলে গণ্য হবে, কোন কোন দলিল বাছাইয়ের সময় গ্রহণযোগ্য হবে এবং এই প্রমাণ হাজির করার দায় পুরোপুরি প্রার্থীর ওপর থাকবে। এতে একদিকে সংবিধানের আনুগত্য-সংক্রান্ত নীতি অক্ষুণ্ণ থাকবে, অন্যদিকে আগ্রহী প্রবাসী নাগরিকরাও আগেভাগেই জানবেন কোন অবস্থানে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
প্রবাসী ছাড়াও এই দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টির সুরাহা এখন অন্য কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। বিগত কয়েক দশকে দেশ থেকে কিছু ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করেছে। বিভিন্ন রিপোর্টে এই পাচারকৃত টাকার পরিমাণ ২২ লক্ষ থেকে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা। এই বিপুল পাচারে দেশের ব্যাংক খাত এখন ধ্বংসপ্রায়। এই লুটেরাশ্রেণির অনেকেই পরবর্তীতে নিজেদের অবৈধ সম্পদের সুরক্ষায় অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন দেশে বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়েছে। ইতিমধ্যেই এরা এদের অবৈধ সম্পদ, প্রভাব ও পেশিশক্তির মাধ্যমে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আইনের ফাঁক গলিয়ে কোনোভাবে এরা যদি আবার সংসদ সদস্য হয়ে পার্লামেন্টে আসতে পারে, তাহলে তা এই দেশ ও জাতির জন্য কত বড় ভয়ংকর ব্যাপার হবে তা সহজেই অনুমেয়।
দ্বৈত নাগরিকত্বের এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা পবিত্র সংসদকে কেমন দেখতে চাই। সংসদ কি কেবল জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতার মঞ্চ, নাকি এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি একক ও প্রশ্নাতীত আনুগত্য অপরিহার্য? সংবিধান দ্বিতীয় ধারণাটিকেই বেছে নিয়েছে। এখন দায়িত্ব আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের এই ধারণাকে স্পষ্ট, ন্যায়সঙ্গত ও পূর্বানুমেয় নিয়মে রূপ দেওয়ার। কারণ গণতন্ত্রে অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, আস্থার সংকট, জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ ও বিকশিত হওয়ার সংকট তত গভীর হয়।
লেখক- হেড অব চেম্বারস- ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ল’ হাউজ
০১৭১৮-০৬৭৪৯৮
Email- blackandwhite.lawhouse@gmail.com

