অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপে পরবর্তী জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। অর্থাৎ, এসব অধ্যাদেশ স্থায়ী হবে কি হবে না, তা নির্ধারণ করবে আগামী সংসদ।
আইনগত দিক থেকেও অবস্থাটি জটিল। কেউ যদি এই অধ্যাদেশগুলোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতের রায় চান, তবে সে ক্ষেত্রে অধ্যাদেশগুলো সম্ভাব্য আইনি জটিলতার মধ্যে পড়তে পারে।
২৫ জানুয়ারি ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ–২০২৬ শিরোনামে ২০২৪–এর গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই অধ্যাদেশের ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বা অভিযোগ নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহার করা হবে।
এ ছাড়া নতুন কোনো মামলা বা অভিযোগ গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা যাবে না বলে ধারা সংযোজন করা হয়েছে অধ্যাদেশটিতে। মূলত জুলাই–আগস্ট মাসে আন্দোলনকারীদের দ্বারা সংঘটিত সব ফৌজদারি অপরাধ থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলো দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে।
বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১৮ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছে মোট ১১৫টি (২০২৪ সালে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১৮টি)।
সর্বশেষ এই দায়মুক্তির অধ্যাদেশ ছাড়াও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন বিষয়ে, যেমন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়সের সীমা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, আন্তর্জাতিক অপরাধ (আদালত) (সংশোধন), গণভোট অধ্যাদেশ এবং নতুন সাংবিধানিক কাঠামো দেওয়ার জন্য একাধিক অধ্যাদেশ জারি করেছে।
এ কথা সত্য যে একটি সরকারকে রাষ্ট্র চালানোর জন্য আইনের আশ্রয় নিতে হয়; যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা আর নেই, তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশ জারির প্রয়োজন ছিল বৈকি! তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো একটি অস্থায়ী এবং অনির্বাচিত সরকারের কি আদৌ ১১৫টি অধ্যাদেশ জারি করার প্রয়োজন ছিল? সংবিধান কী বলে এ বিষয়ে? এই অধ্যাদেশগুলোর আইনি বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতাই–বা কতটুকু থাকবে, নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার পর?
২.
অধ্যাদেশটিতে দায়মুক্তির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। তবে আমরা সবাই জানি, আন্দোলনটি জুলাইয়ের শেষ ১৫ দিন থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই সময়সীমার আগে ও পরে সংঘটিত ফৌজদারি অপরাধের দায়মুক্তি নিয়ে অধ্যাদেশটি ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা থেকেই যায়।
এ ছাড়া অধ্যাদেশটির ধারা ২(ক)–তে বলা হয়েছে, ‘গণ–অভ্যুত্থানকারী’ অর্থ, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পক্ষে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি, যা একটি সমস্যাযুক্ত সংজ্ঞা বলেই মনে হচ্ছে। কেননা, এই সংজ্ঞার ব্যাপকতা এতটাই যে—কোনো ব্যক্তি নিজেকে আন্দোলনকারী হিসেবে তার কৃত অপরাধের দায়মুক্তি চাইতে পারে। কেননা, ‘গণ–অভ্যুত্থানকারী’ হিসেবে এই সুবিধা পাওয়ার মানদণ্ডও এখানে উল্লেখ নেই।
আরেকটি বিষয় হলো, অধ্যাদেশটিতে হত্যাকাণ্ডের সংজ্ঞা হিসেবে ব্যক্তিগত স্বার্থে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ফৌজদারি কার্যবিধি বা সিআরপিসিতে তদন্তের স্থলে সংশোধনী না এনেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের ভার দেওয়াতে পুরো প্রক্রিয়াই ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে ধারণা করা যায়।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে, ১৯৭৩–এর বেশ কিছু ধারা সংশোধন করা হয়েছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে।
আইনটিতে ধারা ২০-সি সংযোজন করে এর উপধারা (১)-এ বলা হয়েছে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল হলেই তিনি আর জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এমনকি তিনি কোনো সরকারি চাকরিও করতে পারবেন না।
অথচ রায় ও সাজা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ১৯৭৩ সালের আইনটির ধারা ২০(২)–এ বলা হয়েছে, ‘কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল ন্যায়সংগত এবং যথাযথ দণ্ড দিতে পারবেন;’ অর্থাৎ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলেই কেবল তাঁকে শাস্তি প্রদান করা যাবে। নতুন সংশোধিত ধারাটি তাই উপরিউক্ত ২০(২) ধারাটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ রকম একটি ধারা আইনের নির্দিষ্ট একটি মৌলিক নীতির পরিপন্থীও বটে, যা ‘প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ বা ‘নির্দোষিতার অনুমান’ হিসেবেই পরিচিত। এই আইনি নীতি অনুসারে যেকোনো অপরাধের জন্য অভিযুক্ত প্রতে৵ক ব্যক্তি সন্দেহাতীতভাবে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা রোম সংবিধির ধারা ৬৬–তেও এই নীতি প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।
৩.
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপর সেপ্টেম্বর মাসে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ–২০২৪ ’-এর খসড়া অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। এ অধ্যাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা, দায়িত্ব নির্ধারণসহ প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের পদমর্যাদা, তাঁদের সুযোগ-সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়েও কিছু ধারা যুক্ত করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রয়োগ করা অধ্যাদেশ, বিধি ও প্রজ্ঞাপনের বৈধতা সম্পর্কে কোনোভাবেই প্রশ্ন উত্থাপন বা একে অবৈধ বা বাতিল করতে পারবে না মর্মেও ধারা যোগ করা হয়।
অধ্যাদেশটির খসড়ায় আরও বলা হয়, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলেও তিনি শপথ নিতে পারবেন না। অথচ আমরা দেখেছি যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরবর্তী সময়ে নিজেই এই ধারা লঙ্ঘন করছে।
এই অধ্যাদেশ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারির প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে আমরা জেনেছি, ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে (বিবিসি নিউজ বাংলা, ১১ নভেম্বর, ২০২৪)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সব কার্যক্রমের একপ্রকার দায়মুক্তি প্রদানের এই অধ্যাদেশ বিশেষ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু এই লেখা লেখার সময় পর্যন্ত অধ্যাদেশের শেষ পরিণতি সম্পর্কে কোনো কিছু জানা যায়নি।
৪.
এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫–এ ‘দায়মুক্তি’ শিরোনামের ধারা ২২–এ বলা হয়, ‘এই অধ্যাদেশ বা কোনো বিধি বা উহার অধীন প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশ মোতাবেক সরল বিশ্বাসে কৃত বা অভিপ্রেত কোনো কিছুর জন্য কমিশন বা অন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা দায়ের করা যাইবে না।’
এভাবে বিভিন্ন সময়ে দায়মুক্তি চাওয়াসহ জারিকৃত অন্য সব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ কী, তা বুঝতে বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩–এর দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক।
অনুচ্ছেদ ৯৩(১) অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে’, তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন; অর্থাৎ সংসদ অধিবেশন না থাকলে বা ভেঙে গেলে যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন, যেমন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে, নতুন কোনো অপরাধ রোধে, বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে সংসদ অধিবেশন না ডাকা পর্যন্ত এই অধ্যাদেশ গুরুত্বপূর্ণ—তবে কেবল রাষ্ট্রপতি একটি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।’
প্রশ্ন হলো, গত প্রায় ১৮ মাসে ১১৫টি অধ্যাদেশ জারি হওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতি কি বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছিল?
অনুচ্ছেদ ৯৩(১) তিনটি শর্তও জুড়ে দিয়েছে অধ্যাদেশের বৈধতা প্রসঙ্গে। এখানে বলা আছে, সংসদ যে আইন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে না, অধ্যাদেশ দিয়ে সেই ধরনের কোনো আইন করা যাবে না। অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধানের কোনো অংশ পরিবর্তন বা বাতিল করাও সম্ভব নয়। এমনকি আগে করা কোনো অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করা যায় না।
আমরা কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে ১১৫টি অধ্যাদেশের প্রতিটি ধারাই সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১)–এ নির্ধারণ করা মানদণ্ডে উতরাতে পারবে?
এ ছাড়া অধ্যাদেশের স্থায়িত্ব ও অনুমোদন বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৯৩(২)–এ বলা আছে, ‘পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই অধ্যাদেশসমূহ উপস্থাপন করতে হবে। সংসদ চাইলে তা পাস করতে পারে বা বাতিল করতে পারে। সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।’
এ ছাড়া সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগ জুডিশিয়াল রিভিউ বা বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো অধ্যাদেশের বৈধতা যাচাই করতে পারেন। আদালত যদি মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতি ছিল না বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে, তাহলে আদালত সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ (১৯৯২) মামলায় আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন যে অধ্যাদেশ জারির জন্য যুক্তিসংগত পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল বলে রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি প্রকাশও বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে নয়।
এই মামলার রায় অনুসরণ করে পীরজাদা সৈয়দ শরীয়তুল্লাহ বনাম বাংলাদশে (২০০৯) মামলায় জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি বলে হাইকোর্ট বিভাগ ‘বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ–২০০৮’ বাতিল করেন। আদালতের যুক্তি অনুযায়ী, এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালনের জন্য অপরিহার্য ছিল না। কেননা, অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষমতা অবশ্যই সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের সংগতিপূর্ণ হতে হবে।
কাজেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোর স্থায়িত্ব ও আইনি বৈধতা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে পরবর্তী জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর। এ ছাড়া কেউ যদি এই অধ্যাদেশগুলোর আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতের মতামত চায়, সে ক্ষেত্রেও অধ্যাদেশগুলো আইনি জটিলতার মধ্যে পড়তে পারে।
-
উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

